লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ হচ্ছে লেনিন কর্তৃক রচিত সংগ্রামের বিভিন্ন সূত্রাবলি

লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ (ইংরেজি: Forms of Leninist struggle) হচ্ছে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান বিপ্লবী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন কর্তৃক সাম্যবাদীদের সংগ্রামের রূপ প্রসঙ্গে রচিত বিভিন্ন সূত্রাবলি। সাম্যবাদী পার্টিগুলোর কাজ করার পদ্ধতি কিরূপ হবে তা নিয়ে লেনিন মানবজাতির সমস্ত লড়াই সংগ্রামের সারমর্ম উপস্থাপন করেছেন। পার্টি গঠনের আরম্ভকালীন সময় থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি সংগ্রামের বহুমুখী ধরণকে আত্মস্থ করে অবিরাম কাজ করেছেন। ১৮৯৭ সালে লিখিত ‘রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের কাজসমূহ’ পুস্তিকাটিতে লেনিন কমিউনিস্টদের কাজকর্মের ধারা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।

ভ্লাদিমির লেনিন সাম্যবাদীদের কাজ কর্মকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক কাজ এবং গণতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক কাজ। এই দুই ধরনের কাজকে আবার তিনভাবে ভাগ করা যায়। এই তিন রকমের কাজ হচ্ছে তাত্ত্বিক কাজ, প্রচার এবং আলোড়ন। উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক নয় যে এসব কাজ পরবর্তীতে সাম্যবাদী আন্দোলনের পরবর্তী বিকাশের সাথে সাম্যবাদী কাজকর্মের আরো বিকাশ ঘটেছে, তবে তা উপরোক্ত মৌল বিষয়গুলোকে নাকচ করেনি। 

লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ উদ্ভবের প্রেক্ষাপট

লেনিনবাদী কর্মপদ্ধতি বলতে আমরা যা বুঝি তা পাওয়া যাবে লেনিনের শেষ জীবনে লেখা পূর্ণাঙ্গ বই “কমিউনিজমে ‘বামপন্থা’র শিশু রোগ”-এ। বইটিকে ইংরেজিতে বলা হয় “Left-Wing” Communism: An Infantile Disorder” এবং বইটি ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয়। এটি এমন একটি লিখিত বই যেখানে তিনি বলশেভিক পার্টির সৃষ্টি, বিকাশ, সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস তুলে ধরেন। এই বইটি মূলত তিনি লেখেন বিভিন্ন দেশের নবীন কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর কাছে রুশ কমিউনিস্টদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য।[১] এই বইয়ে লেনিন বলশেভিকবাদের বিবিধ প্রকার সমালোচনাকারীদের জবাব দেন যেসব সমালোচনাকারীরা নিজেদের অবস্থানকে বাম দিকে দাবি করে আসছিলেন। পরে এই সমালোচনাকারীদের অধিকাংশই মতাদর্শের প্রস্তাবক হিসেবে বামপন্থি সাম্যবাদী নামে বর্ণিত হয়েছিলেন।

লেনিন শ্রমিকদের ভেতরে কাজ করতে পছন্দ করতেন। যেখানেই মজুরদের ভিড়, লেনিন সেখানেই অবস্থান করতেন। লন্ডনে থাকার সময় শুঁড়িখানা, পাঠাগার সব জায়গাতেই ঘুরে বেড়াতেন। পাঠাগারগুলোতে প্রবেশের পথ থাকত সরাসরি রাস্তা থেকে। বসবার জায়গা ছিলো না, স্ট্যান্ডে আটকানো থাকত টাটকা খবরের কাগজ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হতো। পরে লেনিন একবার বলেছিলেন, সোভিয়েত রাশিয়ায় সারা দেশ জুড়ে এমনি ধরনের পাঠাগার হোক তাই তিনি চান। সেসময় মাঝে মাঝে তিনি যেতেন পাবলিক রেস্তোরাঁয়, কখনো কখনো গির্জায় যেখানে শ্রমিকরা আসত। কোনো কোনো গির্জায় প্রার্থনার পরে বক্তৃতা ও আলোচনা হতো, শ্রমিকরা যোগ দিত এই আলোচনায়। লেনিন মন দিয়ে শুনতেন।[২] অর্থাৎ রাজনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে লেনিন যেখানেই জনগণ আছে সেখানেই যেতেন, জায়গাটি যতই না প্রতিক্রিয়াশীলদের দখলে থাকুক। কমিউনিজমে ‘বামপন্থা’র শিশু রোগ বইতে লেনিন লিখেছেন,

“কমিউনিস্টদের গোটা কাজটাই হলো পিছিয়ে পড়াদের বোঝানো, তাদের মধ্যে কাজ করা, মস্তিষ্কপ্রসূত ও ছেলেমানুষী-‘বামপন্থী’ স্লোগান দিয়ে তাদের কাছ থেকে বেড়া তোলা নয়।”[৩] 

এই গ্রন্থে তিনি জানালেন কীভাবে অগ্রগামী বলশেভিক পার্টি বেড়ে উঠল, জোরদার হলো, কীভাবে এবং কেন এ-পার্টি জয় করতে পারল বাধাবিঘ্ন, এবং সেই পার্টির বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যান্য কমিউনিস্ট পার্টি কী শিক্ষা পেতে পারে। ১৯০৩ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বলশেভিকবাদের ব্যবহারিক কাজের ইতিহাস মূল্যায়ন করলেই পাওয়া যাবে লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ ও প্রকৃতি। লেনিন এই গ্রন্থে বিভিন্ন রূপের বৈচিত্র্য সম্পর্কে বলছেন,

“… এই ১৫ বছরে বিশ্বের কোনো একটা দেশও বিপ্লবী পরীক্ষার দিক থেকে, বৈধ ও অবৈধ, শান্ত ও ঝোড়ো, গোপন ও প্রকাশ্য, চক্রনির্ভর ও গণনির্ভর, পার্লামেন্টারি ও সহিংস আন্দোলনের রূপ বদলের দ্রুততা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে এতোখানি অভিজ্ঞতার ধারে কাছেও যায়নি। কোনো একটা দেশেও এত সংক্ষিপ্ত পর্বকালের মধ্যে আধুনিক সমাজের সমস্ত শ্রেণির সংগ্রামের রূপ, রূপভেদ ও পদ্ধতির (ইংরেজি: forms, shades, and methods of struggle) এমন সমৃদ্ধি পুঞ্জীভূত হয়নি।”[৪]

১৯০৩ সালের জুলাইতে পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের আগে বড়ো অংশ জুড়ে আলোচনার বিষয় থাকত পার্টির কর্মসূচি। ১৯০৩ সালে বলশেভিক পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে পার্টির কর্মসূচি নিয়ে খুব তর্ক বিতর্ক চলছিল। সেই সময় যারা বাইরে থেকে ব্যাপারটা দেখতেন তাঁরা অনেকে বিরক্ত হয়ে বলতেন ‘এতো কুটকচালির দরকারটা কী?’ ‘অল্পাধিক’ বা এমনি ধরনের কোনো শব্দ থাকবে কী থাকবে না তাতে কী আসে যায়! জবাবে লেনিন ও ক্রুপ্সকায়া তলস্তয়ের লেখা একটি উপমা দিতেন। তলস্তয় একবার রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন, দেখতে পেলেন দূরে একটি লোক উবু হয়ে বসে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাত নেড়ে চলেছে। লোকটা নিশ্চয় পাগল, তলস্তয় ভাবলেন, কিন্তু কাছে এসে দেখতে পেলেন লোকটা পাথরের ওপরে ঘষে ছুরি শাণ দিচ্ছে। তত্ত্বগত তর্কবিতর্ক সম্পর্কেও একই কথা। বাইরে থেকে শুনে মনে হয় অর্থহীন ঝগড়া। ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।[৫]

বিপ্লবের বছরগুলোতে ১৯০৫-০৭ সালে সমস্ত শ্রেণি এগিয়ে আসছে প্রকাশ্যে। কর্মসূচি ও রণকৌশল সংক্রান্ত সমস্ত অভিমত যাচাই হচ্ছে জনগণের কর্মে। ধর্মঘট সংগ্রামের এমন ব্যাপকতা ও তীব্রতা বিশ্বে অদৃষ্টপূর্ব। অর্থনৈতিক ধর্মঘট বেড়ে উঠছে রাজনৈতিক ধর্মঘটে এবং রাজনৈতিক ধর্মঘট অভ্যুত্থানে। অগ্রগামী প্রলেতারিয়েতের সংগে পরিচালিত দোলায়মান, দ্বিধাগ্রস্ত কৃষকদের সম্পর্কের ব্যবহারিক যাচাই। সংগ্রামের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশে সংগঠনের সোভিয়েত রূপের আবির্ভাব ঘটেছে। এসব কথা বলে লেনিন সিদ্ধান্ত টানছেন,

“সংগ্রামের পার্লামেন্টারি ও অ-পার্লামেন্টারি রূপ, পার্লামেন্টে অংশগ্রহণের রণকৌশলের সংগে পার্লামেন্ট বয়কট করার রণকৌশল, লড়াইয়ের বৈধ রূপ ও অবৈধ রূপ– এদের এক থেকে অপরে বদল তথা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ– এসবই এক আশ্চর্য সমৃদ্ধ সারগর্ভতায় বিশিষ্ট।”[৬]  

এই বইতে লেনিন লিখলেন বলশেভিকবাদী পার্টি বেড়ে উঠেছে ও জোরদার হয়েছে সুবিধাবাদী, সংশোধনবাদী, নৈরাজ্যবাদী, মতান্ধতাবাদী, অর্থনীতিবাদীসহ মেনশেভিক, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারি এবং শ্রমিক শ্রেণি ও মার্কসবাদের অন্যান্য শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। প্রচণ্ড বাধাবিঘ্ন সে জয় করেছে তার সদস্যদের লৌহ পার্টি শৃঙ্খলার, জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বদৌলতে এবং প্রলেতারিয়েতকে উন্নীত করেছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়। মার্কসবাদের সৃজনশীল বিকাশের লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ গ্রহণ করেই তা সম্ভব হয়েছে।

দক্ষিণপন্থি সুবিধাবাদকে প্রধান বিপদ বলে গণ্য করার সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টির ‘বামপন্থী’ কর্মীদের ভুলের কঠোর সমালোচনা করেন এই বলে যে জনগণ প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ও কর্তব্য এরা সঠিক বোঝেনি, বুর্জোয়া সংসদ ও ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করতে অস্বীকার করছিল তারা, অন্যান্য পার্টির সংগে আপোষ ও সমঝোতার সম্ভাবনা মানছিল না। বিপ্লবী কাজের বদলে তারা আনছিল বিপ্লবী বুলি। শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের পক্ষে, সমগ্র বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষে এটা ছিল ক্ষতিকর ও বিপদজনক, তার পরিণতি হচ্ছিল জনগণের সংগে পার্টির সম্পর্কচ্ছেদ। বিশ্ব প্রলেতারিয়েতের নেতা লেনিন বললেন,

“যেখানেই জনগণ আছে অবশ্যই সেখানেই কাজ করতে হবে কমিউনিস্টদের। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান, সংঘ ও সমিতিতে প্রলেতারিয় ও আধা-প্রলেতারিয় জনগণ আছে– তা সে যতই প্রতিক্রিয়াশীল হোক– ঠিক সেখানেই, নিয়মিত অধ্যবসায়ের সংগে, অবিচলভাবে ও ধৈর্য ধরে প্রচার ও আন্দোলন চালিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে প্রচণ্ডতম বাঁধাকে অতিক্রম করার জন্য, সব রকম ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে।”[৭]

নমনীয় রণকৌশলের শিক্ষা দিলেন লেনিন, প্রত্যক্ষ কর্তব্যের ক্ষেত্রে সাধারণ সত্যের বুলিবাগীশ গৎবাঁধা প্রয়োগের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলেন। সেইসংগে তিনি বললেন যে, কোনো দেশের বৈশিষ্ট্যসূচক কোনো সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মুহূর্তের জন্যও সাম্রাজ্যবাদীদের ক্ষমতা উচ্ছেদ এবং সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম নির্মাণের মূল আন্তর্জাতিক কর্মটি ভোলা চলবে না। লেনিনের এই রচনাটির সাহায্যে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি তাদের ভুল শোধরাতে পারে, আরো সাফল্যের সংগে সংগ্রাম চালাতে পারে শ্রমিক শ্রেণির শত্রুদের সংগে, হয়ে উঠতে পারে জনগণকে সংগে টানতে সমর্থ পোক্ত মার্কসবাদী পার্টি।[৮] অর্থাৎ রুশদেশে লেনিনবাদী সংগ্রামের বিপ্লবী নীতি ও কৌশলের নানা রূপ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্যের নানা দিক ব্যাখ্যাত হয় এই গ্রন্থে। লেনিনবাদী নীতি বলতে আজ আমরা যা বুঝি তার রূপ রয়েছে এই বইতে।[৯]

তথ্যসূত্র:

১. অবিচকিন, গ. দ.; অস্ত্রউখভা, ক. আ.; পানক্রাতভা, ম. ইয়ে.; স্মিনর্ভা, আ. প. (১৯৭১)। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন সংক্ষিপ্ত জীবনী (১ সংস্করণ)। মস্কো: প্রগতি প্রকাশন। পৃষ্ঠা-২১০-২১২।
২. অমল দাশগুপ্ত, “কারাগারে ও নির্বাসনে”, কমরেড লেনিন (এনবিএ-র প্রথম সংস্করণ)। কলকাতা এনবিএ, ২০১৩, পৃ: ৮৭। আইএসবিএন 978-81-7626-291-5
৩. লেনিন, ভি আই; কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ, এপ্রিল-মে, ১৯২০, রচনা সংকলন, চার ভাগে সম্পূর্ণ, চতুর্থ ভাগ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা- ৫৬।
৪. লেনিন, ভি আই; কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ, এপ্রিল-মে, ১৯২০, রচনা সংকলন, চার ভাগে সম্পূর্ণ, চতুর্থ ভাগ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা- ১৬।
৫. অমল দাশগুপ্ত, পূর্বোক্ত, পৃ: ৯৬-৯৭
৬. লেনিন, ভি আই; কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ, এপ্রিল-মে, ১৯২০, রচনা সংকলন, চার ভাগে সম্পূর্ণ, চতুর্থ ভাগ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা- ১৭।
৭. লেনিন, ভি আই; কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ, এপ্রিল-মে, ১৯২০, রচনা সংকলন, চার ভাগে সম্পূর্ণ, চতুর্থ ভাগ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪, পৃষ্ঠা- ৫৬।
৮. অবিচকিন, গ. দ.; অস্ত্রউখভা, ক. আ.; পানক্রাতভা, ম. ইয়ে.; স্মিনর্ভা, আ. প. (১৯৭১)। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন সংক্ষিপ্ত জীবনী (১ সংস্করণ)। মস্কো: প্রগতি প্রকাশন। পৃষ্ঠা-২১০-২১২।
৯. প্রবন্ধটি প্রথমে রোদ্দুরে ডট কমে প্রকাশিত হয়। ফুলকিবাজ-এ প্রকাশের সময় কয়েকটি বাক্য যুক্ত করা হয়েছে এবং শব্দগত সম্পাদনা করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!