আর্নেস্ট বার্কার সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী মতামত প্রদান করেন

স্যার আর্নেস্ট বার্কার (ইংরেজি: Ernest Barker, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৭৪ – ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০) ছিলেন একজন ইংরেজ উদারবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। সাম্যের প্রশ্নে তিনি উদারবাদী মতামত প্রদান করেন। অধ্যাপক আর্নস্ট বার্কার মনে করেন আইনগত ও সামাজিক সাম্য সকলের ক্ষেত্রে সাম্য আনতে পারে। রাষ্ট্রচিন্তার নানা ধারার নিরিখে সমতার উদারবাদী ভাবনাকে বিচার করে তার অকার্যকর দিকটি উপলব্ধি করা দরকার।

সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী চিন্তা আলোচনার কারণ হচ্ছে যাতে বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা উদারবাদী ভাবনার ব্যর্থতা সম্পর্কে চিন্তার খোরাক পেতে পারেন এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে। ইংরেজ বৌদ্ধিক ঘরানায় লালিত বার্কার সাম্যের কোনো তাত্ত্বিক ভাবনায় না গিয়ে সমতাকে অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারণা হিসাবেই ভেবেছেন এবং ব্যক্তি ও সমাজজীবনে এর তাৎপর্যকে বিচার করছেন।

সাম্যের প্রশ্নে আর্নেস্ট বার্কার যে চিন্তা করেছেন:

  • সাম্য অধিকার বণ্টনের এক পদ্ধতিগত নিয়মাবলি, যা ন্যায়ের অনুসরণে গঠিত এবং ন্যায় থেকে উদ্ভুত এক নিয়ম। 
  • সাম্য হচ্ছে শুরু, সমাপ্তি নয়। এর সমাপ্তি নির্ভর করে মানুষের উপর। মানুষ একে কীভাবে নেবে, এর জন্য। কি করবে এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি একার ব্যাপার নয়, সকলের।
  • সাম্যের দুটি দিক—আইনগত ও সামাজিক সাম্য। আইনগত সাম্য হলো আইনের চোখে সাম্য। বৈধ সংস্থা, রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে নাগরিক এই সমতা ভোগ করে। আইনগত সাম্য এলেই ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশ হবে তা নয়। চাই সামাজিক সাম্য। পরিপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে মানুষের সামর্থ্যকে সমান করা বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দ্বারা মানুষের আর্থিক সঙ্গতির সমতা বিধানই হলো সামাজিক সাম্য। 
  • বার্কার বলেন, সমতা পরিবর্তনশীল ধারণা। আগে ধারণা ছিল সামাজিক যোগ্যতা অর্জন করলেই সাম্যের আইনগত যোগ্যতা আসে। আজকের দাবি হলো আইনের যোগ্যতার গুণেই সামাজিক যোগ্যতা আসবে। 
  • বার্কার মনে করেন আইনের চোখে সমতার ধারা গ্রাহ্য হলেও আইনগত সমস্যা থেকেই গেছে। অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যয়ভার বহনে অসাম্য থাকলে সকলের পক্ষে অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সমান ক্ষমতা লাভ সম্ভব নয়।
আরো পড়ুন:  হ্যারল্ড লাস্কি সাম্যের প্রশ্নে উদারনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সামাজিক সাম্যের পক্ষে

 সামাজিক সাম্য প্রসঙ্গে বার্কারের মতামত শিক্ষাপ্রদ : 

১. আজও আর্থিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাম্যের সমস্যা আছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে অসাম্য দূর করার ব্যবস্থা হলেও কতিপয়ের সঙ্গে অধিকাংশের ব্যবধান থেকেই গেছে। ওই ব্যবধান সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে সাম্য বজায় না থাকার কারণ হলো মানসিক আগ্রহ ও ক্ষমতার দিক থেকে মানুষের মধ্যে প্রকৃতিগত পার্থক্য এবং কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে মানসিক উপাদনের বিভিন্নতা।

২. আর্থিক ক্ষেত্রে সমবণ্টনের পথ দুর্গম। কারখানা আইনের মাধ্যমে কিছু ব্যবস্থা হলেও এক্ষেত্রে বিংশ শতকের আগে সমস্যার সুরাহা হয়নি। মর্যাদার প্রশ্নে পরিচালক ও কর্মীদের মধ্যে সমান অবস্থা সৃষ্টি সম্ভব কিনা এবং সম্পত্তি ও আয়ের ক্ষেত্রে বন্টনের অসাম্য সংশোধন বা তার পদ্ধতিগত প্রশ্নে সমস্যা আছে। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে এগোলেও (যেমন ধনীদের আয়ের উপর তারতম্যমূলক কর স্থাপন কার পুঁজির কেন্দ্রীভবন রোধ বা আইনের সাহায্যে গরিবের আয় বৃদ্ধি) অসাম্য থেকেই গেছে।

বার্কার মনে করল আইনগত সাম্যকে বাস্তবায়িত করতে গেলে আর্থিক সাম্য একান্ত প্রয়োজন। সম্পত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে অসাম্যকে সংশোধন করা প্রয়োজন নৈতিকতার স্বার্থেই। যা হোক বার্কার যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো অনুসরণ করে সাম্যের দিকে পৃথিবী বিন্দুমাত্র আগায়নি। সমতার প্রশ্নে ইংল্যান্ডের উদারবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্নস্ট বার্কার বক্তব্যের সারাংশ আমাদেরকে দেখাবে গত একশ বছরে কেন শোষণ ও বৈষম্য বেড়েছে?

তথ্যসূত্র

১. দেবাশীষ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়সমূহ, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৯, পৃষ্ঠা ৫৪-৫৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!