বিশ্বকোষ বা জ্ঞানকোষ বুর্জোয়া বিপ্লবের উদ্দেশ্যে রচিত মানব জ্ঞানের সারাৎসার

বিশ্বকোষ বা জ্ঞানকোষ (ইংরেজি: Encyclopedia) হচ্ছে একটি উল্লেখ বিশিষ্ট কাজ বা সংকলন যা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বা শৃঙ্খলার জন্য সাধারণ বা বিশেষ জ্ঞানের সারাংশ প্রদান করে। বিশ্বকোষ হচ্ছে পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়া বিপ্লব ঘটানোর জন্য কয়েকটি খণ্ডে রচিত মানব জ্ঞানের সারাৎসার। পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও সাম্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা সৃজন করবার দার্শনিকবৃন্দও বিশ্বকোষ রচনায় গুরুত্ব আরোপ করেন।

ফরাসি বিপ্লব সংঘটনের পূর্বে ফরাসি দেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মুক্তবুদ্ধি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারের জন্য যাঁরা বিশ্বকোষ রচনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের ‘এনসাইক্লোপিডিস্টস’ বা বিশ্বকোষিকবৃন্দ বলা হয়। যুক্তি, বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্যের উপর এই ফরাসি বিশ্বকোষের ১৭টি খণ্ড এবং তিনটি সংযোজনী খণ্ড ১৭৫১-১৭৮০ সনের মধ্যে প্রকাশিত হয়। অষ্টাদশ শতকের ফরাসি বিপ্লবের ভাব ও আদর্শগত পথ উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে এই বিশ্বকোষের এক এতিহাসিক অবদান ছিল। ডি. আলেম্বার্টের সহযোগিতায় চিন্তাবিদ এবং অদমনীয় উদ্যোগী পুরুষ ডেনিস দিদেরো এই বিশ্বকোষ রচনা প্রচেষ্টার মূল শক্তি হিসাবে ১৭৭২ সন পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। এই বিশ্বকোষিক চিন্তাবিদদের মধ্যে অপর যাঁরা অন্তর্ভূক্ত ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন মন্টেস্কু, রুশো, ভলটেয়ার, হলবাক এবং হেলভেটিয়াস।[১]

প্রথম দিকে Cyclopedia কিংবা Universal dictionary of Sciences এর মতো একটি বিশ্বকোষের পরিকল্পনা ছিলো। দিদেরোর পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত এটি একটি মৌলিক গ্রন্থে পরিণত হয়। দিদেরো একটি বিজ্ঞপ্তির দ্বারা এই বিশ্বকোষের আর্বিভাব ঘোষণা করেন। ডি. আলেম্বার্ট বা দালিমবেয়ারের দিসকুর প্রিলিমিনের নামক নিবন্ধ এই বিশ্বকোষের মুখবন্ধ। বিশ্বকোষের প্রথম খণ্ড ১৭৫১-এর জুলাই মাসে প্রকাশিত হয়, দ্বিতীয় খণ্ড অক্টোবরে। কিন্তু তারপর রাজপরিষদের আদেশে এই গ্রন্থের প্রকাশ ১৮ মাসের জন্যে বন্ধ থাকে। পরবর্তী ৪ খন্ড বিনা বাধায় প্রকাশিত হয়। সপ্তম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৭৫৭-তে। ১৭৫৯-এ রাজপরিষদের আদেশে প্রকাশিত খণ্ডসমূহের প্রচার বন্ধ হয়। এরপর দালেমবেয়ার হতাশ হয়ে এই কাজে বিরত হন। কিন্তু দিদেরো সরকারের, বিশেষত মালশ্যবের, মৌন সম্মতি নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। ১৭৬৫-তে শেষ দশখন্ড এক সঙ্গে প্রকাশিত হয়। সঙ্গে প্রকাশিত হয় ছবির প্লেটের পাঁচ খণ্ড। ১৭৭২-এ প্রকাশিত হয় ছবির প্লেটের আরো ছয় খণ্ড। দিসকুর প্রিলিমিনেরে দালেমবেয়ার বিশ্বকোষের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। যে-কাজ আমরা আরম্ভ করেছি তার উদ্দেশ্য দ্বিবিধ : বিশ্বকোষরূপে মানবিক জ্ঞানের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা; বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পের যুক্তিসিদ্ধ আভধানরূপে এই তিনটি শাখার ভিত্তি যে-সাধারণ নিয়ম তার ব্যাখ্যা। আমাদের অনুসন্ধানের বিষয় আমাদের জ্ঞানের উৎস ও প্রজন্মপরিচয় নির্ধারণ।[২]

আরো পড়ুন:  সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ

পরবর্তীকালে আমরা অনেক বিশ্বকোষীয় মানুষ পেয়েছি। যেমন, অর্থনীতিবিদ সিসমন্দির (১৭৭৩-১৮৪২) রচনাবলী ৭০ খণ্ডের। তাঁর মতো আরো শত শত মানুষের তৈরি রেনেসাঁ যারা গোটা দুনিয়ার জ্ঞানকে ইউরোপে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। লেনিন এই সিসমন্দির বিরুদ্ধে লেখেন ‘অর্থনৈতিক রোমান্টিকতাবাদের চরিত্র নির্ধারণ’ গ্রন্থ।

এমনকি ষোড়শ শতকে ইউরোপে আরেকজন বিশ্বকোষীয় মানুষ কনরাড গেসনার (১৫১৬ – ১৫৬৫) জন্ম নেন যিনি ছিলেন একজন সুইস প্রকৃতিবিজ্ঞানী। তার প্রধান গবেষণা ও অবদান প্রাণীবিজ্ঞানে, একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়েও তিনি অনুশীলন করেছিলেন। সংগ্রহ করেছিলেন উদ্ভিদের নমুনা, স্থাপন করেছিলেন উদ্ভিদ প্রাঙ্গণ, উদ্ভিদের শ্রেণি বিভাজন করে ও তাদের ভেষজগুণ বর্ণনা করে রচনা করেছিলেন একাধিক বই। লিখেছিলেন ভাষা বিষয়ক বই ও প্রথম আন্তর্জাতিক গ্রন্থপঞ্জিকোষ “দি ইউনিভার্সাল লাইব্রেরি”। জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি, ইতালিয়ান, গ্রিক, লাতিন ও বিভিন্ন প্রাচ্য ভাষা তার জানা ছিল। মজার বিষয় হচ্ছে যখন ভারতের ‘মানুষ ডিম আগে না মুরগি আগে’ বিতর্কে দিনের পর দিন ব্যয় করছে তখন গেসনার বিবর্তনের চিন্তাকে ভ্রূণাকারে তুলে আনছেন।

তথ্যসূত্র

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৫১।
২. প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী, ফরাসী বিপ্লব, পৃষ্ঠা ৪৭৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!