কৌটিল্যের দণ্ডনীতি হচ্ছে কৌটিল্য আলোচিত রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের ষষ্ঠ উপাদান

কৌটিল্যের দণ্ডনীতি বা বলনীতি বা দণ্ড (ইংরেজি: Dandaniti of Kautilya) হচ্ছে চাণক্য কৌটিল্যের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় আলোচিত রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের ষষ্ঠ উপাদান। দণ্ড শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলেও রাষ্ট্রের উপাদান হিসেবে দণ্ড শব্দটির ব্যবহার করা হয়েছে সেনাবাহিনীকে বোঝাতে।

কৌটিল্যের মতে, দণ্ডের মধ্যে বংশানুক্রমিক এবং ভাড়াটে এই দু’রকমের সৈনিকই থাকবে। সৈন্যবাহিনীতে পদাতিক, অশ্বারোহী, রথারোহী ও হস্তিবাহিনী থাকবে। বনাঞ্চল এবং অন্যান্য দুর্গম অঞ্চলের জন্য দক্ষ বাহিনী দরকার। ব্রাক্ষণ ও বৌদ্ধ শাস্ত্রে ক্ষত্রিয়কে সৈন্যবাহিনীর উপযুক্ত এবং যুদ্ধই ক্ষত্রিয়ের জাত-কাজ বলা হয়েছে। মনুসংহিতায় বা মহাভারতে অবশ্য রাষ্ট্রের আপৎকালীন অবস্থায় ব্রাহ্মণ ও বৈশ্যকেও সৈন্যবাহিনীতে যোগদানের কথা বলা হয়েছে।

কৌটিল্য অবশ্য বৈশ্য ও শূদ্রকেও সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগের পক্ষপাতী। সম্ভবত কৌটিল্য যখন অর্থশাস্ত্র রচনা করেন তখনও জাত-ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণে বংশানুক্রমিক সৈনিকের কথা বললেও ভাড়াটে সৈনিকও কৌটিল্যের রচনায় স্থান পেয়েছে। সৈনিকের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সৈনিক হবে দক্ষ, ধৈর্যবান, জয়পরাজয় সম্পর্কে বিগতমনা, রাজানুগত এবং রাজার আজ্ঞাবহ। সৈনিক ও তার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণপোষণের দায়িত্ব থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।[১]

কৌটিল্যের দণ্ডনীতি প্রয়োগ ও প্রকারভেদ  

প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তকগণ দণ্ডদানের মাধ্যমে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের কথা বলেছেন। কৌটিল্যের মতে, দণ্ডের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও মাৎস্যন্যায়ের উদ্ভব হয়। তিনি বলতেন, ‘No Danda, No. State’. রাজা যখন রাজদণ্ড দ্বারা দেশ শাসন করেন তখন সকল বর্ণ ও ধর্মের মানুষ নিজেদের কর্তব্য ও বৃত্তি যথাযথভাবে পালন করে। 

কৌটিল্য দণ্ডের প্রধানত তিনটি প্রকরণ উল্লেখ করেছেন : (ক) অর্থদণ্ড, (খ) কায়িক দণ্ড (কশাঘাত অঙ্গছেদন, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতি) এবং (গ) নির্বাসন। কৌটিল্য দণ্ড প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য বিবেচনার কথা বলেছেন। দণ্ডের তীক্ষ্ণ প্রয়োগ সমাজে উদ্বেগ ও ত্রাসের সৃষ্টি করে এবং প্রজাসাধারণকে রাজদ্রোহী করে তোলে। দণ্ডের মৃদু প্রয়োগে রাজার শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রজারা তাঁকে মান্য করে না। দণ্ডের আদৌ প্রয়োগ না হলে মাৎস্যান্যায় ফিরে আসে। দণ্ড যখন সুবিহিতভাবে প্রয়োগ করা হয় তখন মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হয়, প্রজাসাধারণ রাজাকে শ্রদ্ধা করে। এর ফলে মানুষের জীবনে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ অর্জিত হয়। 

আরো পড়ুন:  মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা

লোভ কিংবা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে দণ্ড প্রয়োগ হলে গৃহবাসীরা তো বটেই, ঋষি ও বনবাসীরাও ক্ষুব্ধ হন। অর্থশাস্ত্রে বারবার দণ্ডের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। দণ্ড প্রয়োগে রাজা সর্বদা ন্যায়বিচারকেই অবলম্বন করবেন। দণ্ড পক্ষপাতহীনভাবে প্রযুক্ত হবে, তা সে শক্রর প্রতিই হোক কিংবা রাজপুত্রের প্রতিই হোক। হত্যা প্রভৃতি মারাত্মক অপরাধের জন্যই কেবল কৌটিল্য গুরুদণ্ডের বিধান করেছেন, না হলে তার দণ্ড প্রধানত শুদ্ধিমূলক।

তথ্যসূত্র

১. ড রাধাকৃষ্ণ দে, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঐচ্ছিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৃতীয় পত্র, একক ৩৩ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, সপ্তম পুনর্মুদ্রণ আগস্ট ২০১৯, পৃষ্ঠা ২১
২. বায়েজীদ আলম, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page