প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্ব হচ্ছে দার্শনিক প্লেটো ও তার অনুসারীদের বিকশিত জ্ঞানের তত্ত্ব

প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্ব (ইংরেজি: Platonic epistemology) হচ্ছে, দার্শনিক আলোচনায়, গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং তার অনুসারীদের দ্বারা বিকশিত জ্ঞানের একটি তত্ত্ব।

জ্ঞানতত্ত্বে প্লেটো একটা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির কথাও উল্লেখ করেছেন। এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির দুটি দিক। একদিকে আমরা ক্রমাধিক সাধারণীকরণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সাধারণ সত্যে আরোহণ করি। অপরদিকে সর্বোচ্চ সাধারণ সত্য থেকে ক্রমান্বয়ে অল্প থেকে অল্পতর সাধারণ সত্যের মাধ্যমে আমরা দৈনন্দিন বিশেষ সত্য বা ভাবে আরোহণ করি।[১]

প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্ব বিষয়টির উদ্ভব ও বিকাশ

সফিস্ট দার্শনিকরা ইন্দ্রিয়ানুভূতিকেই জ্ঞান বলেছেন। প্লেটো এই মতটিকে ভ্রান্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কারণ ইন্দ্রিয়ানুভূতিই সত্য – ধারণাটি বাস্তবিক সত্যতা নির্ধারণে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারে। একই ঘটনা বা বস্তু একজনের কাছে সত্য আবার অন্য জনের কাছে মিথ্যা প্রতিভাত হতে পারে। তাই প্রকৃত সত্য বা জ্ঞান ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে লাভ করা সম্ভব হয় না। সক্রেটিসকে অনুসরণ করে প্লেটো বলেন জ্ঞানকে অভ্রান্ত ও বাস্তব হতে হবে। মতামত ভ্রান্ত হতে পারে কিন্তু জ্ঞান সর্বদাই অভ্রান্ত হবে। জ্ঞান হলো এক স্থায়ী মানসিক অবস্থা যা দেশ কাল পাত্র ভেদে অভ্রান্ত।

প্লেটো সক্রেটিসকে অনুসরণ করে Concept বা ধারণাকে যথার্থ জ্ঞানের বিষয় রূপে গণ্য করেছেন। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে যে সাধারণ বৈশিষ্ঠ্য বর্তমান, সেটাই ধারণা। ধারণা গঠনের মাধ্যমেই জ্ঞানের যথাযথ বিকাশ হয়, সুতরাং জ্ঞান হলো ধারণা নির্ভর। ধারণা বুদ্ধিগ্রাহ্য, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় এবং অপরিবর্তনীয় ও সামগ্রিক। যে সব বস্তু আমরা চোখে দেখি তাদের সম্বন্ধে আমাদের চেতনায়ও একটি ধারণা তৈরি হয়। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সত্য পরিবর্তনশীল। কিন্তু চেতনায় যে ধারণার জন্ম হয় তা অপরিবর্তনশীল এবং প্রকৃত সত্য। প্লেটো আপাত সত্য ও যথার্থ সত্যের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত কিছুই আপাত সত্য আর চেতনার মাধ্যমে যথার্থ সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ আপাত সত্যকেই যথার্থ সত্য বলে মনে করে কিন্তু দার্শনিকরাই কেবল যথার্থ সত্যের স্বরূপ জানেন।

আরো পড়ুন:  এরিস্টটলের দাসতত্ত্ব হচ্ছে দাসযুগের শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমর্থনকারী মতবাদ

প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্ব নির্মিত ভাববাদী দর্শনের উল্লেখযোগ্য তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো –
i) শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে জ্ঞান সম্ভব নয়, প্রকৃত জ্ঞান অতীন্দ্রিয় জগতে বিদ্যমান।
ii) এক চিরন্তন ধারণা বা আদর্শ হলো যথার্থ সত্য এবং তা দৃশ্যমান বিষয় থেকে স্বতন্ত্র।
iii) আপাত বিক্ষিপ্ত সত্যের মূল্যায়ন যথার্থ সত্যের নিরীখে করা উচিত কেননা যথার্থ সত্যের আলোকেই চিরন্তন আদর্শ গড়ে ওঠে, – এই দার্শনিক অবস্থান থেকেই প্লেটো ন্যায়তত্ত্বের চরিত্র বিশ্লেষণ এবং আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণার ব্যাখ্যা করেন।[২]

তথ্যসূত্র

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৩১১-৩১২।
২. গোবিন্দ নস্কর, রাষ্ট্রচিন্তা, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ২।

Leave a Comment

error: Content is protected !!