দর্শনের স্বরূপ বা দর্শনের প্রকৃতি হচ্ছে প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সংশ্লেষণ

দর্শনের প্রকৃতি বা দর্শনের স্বরূপ (ইংরেজি: Nature of Philosophy) হচ্ছে প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সংশ্লেষণ। অন্য অর্থে দর্শন জগৎ, জীবন, মানুষের সমাজ, তার চেতনা ও জ্ঞানের প্রক্রিয়া প্রভৃতির মৌলিক বিধানসমূহের আলোচনা।[১]

মানুষের সামাজিক চেতনার বিকাশের একটা পর্যায়েই মাত্র মানুষের পক্ষে বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিয়ে জগত এবং জীবন সম্পর্কে চিন্তা করা সম্ভব হয়েছে। মানুষ তার নিজের উদ্ভব মুহূর্ত থেকেই চিন্তার এরূপ ক্ষমতা দেখাতে সক্ষম ছিল না। মানুষের চেতনার বিকাশের একটা স্তরে মানুষ তার পরিবেশ সম্পর্কে চিন্তা করতে আরম্ভ করে। নিজের জীবনকে অধিকতর নিশ্চিত করে রক্ষা করার প্রয়োজনে মানুষ প্রকৃতিজগতের রহস্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করে। প্রকৃতি, জগত এবং পরবর্তীকালে মানুষের নিজের দেহ এবং চেতনা সম্পর্কেও সে চিন্তা করতে শুরু করে।[১]

বুৎপত্তিগত দিক থেকে দর্শন:

দর্শনের স্বরূপ জানতে হলে, আমাদের প্রথমে জানতে হবে দর্শন কী? এর উৎপত্তি কোথা থেকে, এর বৈশিষ্ট্য কী, এর বিষয়বস্তু কী, লক্ষ্য কী? দর্শন শব্দটি মূলত সংস্কৃত শব্দ, এর সাধারণ অর্থ দেখা। ‘দৃশ’ ধাতু থেকে দর্শন শব্দের উৎপত্তি। দর্শন বলতে সাধারণত চাক্ষুষ প্রত্যক্ষণকে বুঝায়, তবে এখানে দর্শন মানে তত্ত্ব-দর্শন, জগৎ ও জীবনের স্বরূপ উপলব্ধি।

দর্শনের ইংরেজি প্রতিশব্দ Philosophy শব্দটি গ্রিক শব্দ Philos এবং Sophia থেকে উদ্ভূত হয়েছে। Philos শব্দের ইংরেজি অর্থ Loving এবং বাংলা মানে অনুরাগ। Sophia শব্দের ইংরেজি অর্থ Knowledge or Wisdom এবং বাংলা মানে জ্ঞান বা প্রজ্ঞা। কাজেই Philosophy শব্দের ধাতুগত অর্থ হয় ‘জ্ঞান বা প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ।’ অন্যদিক থেকে দর্শন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ। ‘দৃশ’ ধাতু এবং ‘অনট’ সংস্কৃত প্রত্যয়যোগে শব্দটির উৎপত্তি। দর্শন বলতে চাক্ষুস প্রত্যক্ষণকে বুঝালেও দর্শন শুধু চাক্ষুস প্রত্যক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দর্শন মানে তত্ত্ব দর্শন, জগৎ ও জীবনের স্বরূপ উপলব্ধি। সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বা তত্ত্ব সাক্ষাতকারই দর্শন।[২]

দর্শনের সংজ্ঞায় বলা যায়, এটি এমন একটি বিদ্যা যা অনুদার মতবাদ, ভাবাবেগ ও অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান বা সত্যের অনুসন্ধানে উদার দৃষ্টিভঙ্গি, অনুধ্যান, বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের মাধ্যমে সত্তা, জগৎ ও জীবনের সাথে জড়িত চিরন্তন সমস্যাবলির সুষ্ঠু, যুক্তিসম্মত ও দৃঢ় আলোচনা করার একটা প্রচেষ্টা।

দর্শনের কতিপয় বৈশিষ্ট্য 

বিস্ময় থেকে জিজ্ঞাসা এবং জিজ্ঞাসা থেকেই দর্শনের উৎপত্তি। এই বিচিত্র জগতের দিকে মানুষ যখনই তাকিয়ে দেখে তখনই বিস্ময়ে তার মন ভরে ওঠে। তার মনে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। তার মনে নানা রকম প্রশ্ন জাগে, এই বিশ্বের উৎপত্তি কোথা থেকে, কোথায় এর শেষ, এর কোনো স্রষ্টা আছে কিনা, থাকলে তিনি কেমন, তার স্বরূপ কী? আমি কে, কোথা থেকে এলাম ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। বিস্ময় থেকে মানুষের মনে জেগে ওঠে জানার আকাঙ্ক্ষা। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চায়, তার এই আকাক্ষা চরিতার্থ করতে। এভাবেই উদ্ভব হয় দর্শনের। জগৎ বিখ্যাত গ্রিক ভাববাদী দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, “বিস্ময় থেকে দর্শনের উৎপত্তি।”[২]

আরো পড়ুন:  দর্শনের বিষয়বস্তু হচ্ছে অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব ও মূল্যবিদ্যার বিভিন্ন শাখা

দর্শন হচ্ছে প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সংশ্লেষণ

বিশ্বজগত সম্পর্কে আদিকালে মানুষের জ্ঞানের পরিমাণ খুব বেশি ছিলো না। দর্শনই হচ্ছে আদি জ্ঞানের মূল ভাণ্ডার। জগত ও জীবনের প্রত্যেকটি সমস্যা মানুষের কাছে প্রশ্ন আকারে উপস্থিত হয়। যে প্রশ্নই উপস্থিত হোক না কেনো মানুষ তার একটা জবাব দিয়ে প্রকৃতিকে বশ করার চেষ্টা করেছে। তাই আদি দর্শন একদিকে যেমন সমস্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার তেমনি আবার তার মধ্যে সমস্যার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে সমাধানের বদলে কাল্পনিক সমাধানের সাক্ষাৎ অধিক মেলে।

কালক্রমে মানুষের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুরাতন দার্শনিক কল্পনা বাস্তব জীবনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তার স্থানে অধিকতর সঠিক সমাধান আবিষ্কৃত হতে থাকে। এইভাবে অধিকতর বাস্তব এবং সুনির্দিষ্ট আলোচনার ভিত্তিতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিকশিত হতে থাকে। পূর্বে প্রকৃতি, পদার্থ, সমাজ, চেতনা, যুক্তি, অর্থনীতি, ধর্ম, সবই দর্শনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কালক্রমে তাদের প্রত্যেকে এক একটি ভিন্ন বিজ্ঞান বা আলোচনার শাখায় রূপান্তরিত হতে থাকে। এই বিকাশের পরিমাণে বর্তমানে দর্শন বলতে কেমলমাত্র কল্পনার উপর নির্ভরশীল কোনো বিষয় আর অবশিষ্ট নেই।

তাই দর্শনের প্রাচীন সংজ্ঞা এবং তার বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। সুনির্দিষ্টভাবে মানুষের জ্ঞান বিকশিত হওয়ার পরেও দর্শনকে অনেকে কল্পনার মধ্যে আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন। এই প্রয়াসে দর্শন জীবনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কশূন্য হয়ে পড়ে। যেখানে প্রাচীনকালে জীবনের সমস্যাই দর্শনের বিকাশ ঘটিয়েছে সেখানে আধুনিক কালের এরূপ প্রয়াস দর্শনকে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য অবাস্তব কল্পনায় পর্যবসিত করেছে। দর্শনের এই সংকটের সুস্পষ্ট নির্দেশ দেন ঊনবিংশ শতকে কার্ল মার্কস।

প্রকৃত সত্যের সন্ধান বা জ্ঞানের অন্বেষণ করাই দর্শনের স্বরূপ

প্রত্যেকেই জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কিছু ধারণা করে। কিন্তু এই ধারণা সব সময় যথার্থ বা সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। দর্শনের কাজ হলো, মানুষের এই সাধারণ ধারণাগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে সুসংহত ও সঠিক জ্ঞান প্রদান করা।

আরো পড়ুন:  দর্শনের তিন ধরনের কাজ হচ্ছে অনুধ্যানমূলক, সমালোচনামূলক এবং গঠনমূলক

তত্ত্ববিদ্যার প্রকৃতি অন্বেষণ করা 

বস্তুর স্বরূপ বা যথাযথ রূপ সম্পর্কে জ্ঞানদান করাও দর্শনের কাজ। দর্শনের অন্তর্ভুক্ত তত্ত্ববিদ্যা (Ontology) বস্তুর দুটি রূপ সম্পর্কে আলোচনা করে। একটি বস্তুর বাহ্যিক রূপ, অপরটি বস্তুর প্রকৃত বা আন্তর রূপ। একটি বস্তুকে আমরা যেভাবে দেখতে পাই, তা হলো বস্তুটির বাহ্যিক রূপ। বস্তুর এই রূপকে বলা হয় অবভাস (Phenomenon) এবং বস্তুটির প্রকৃত রূপকে বলা হয় আন্তর সত্তা (Noumenon বা Reality)। বাহ্যরূপের অন্তরালে বস্তুর যে প্রকৃত রূপ থাকে তা জানাই তত্ত্ববিদ্যার কাজ। আকাশ যে নীল তা আমরা প্রত্যক্ষ করি – এটা হলো আকাশের বাহ্যিক রূপ। আর আমরা জানি, প্রকৃতপক্ষে আকাশের কোনো রং নেই – এটি হলো আকাশের প্রকৃত রূপ বা আন্তর সত্তা।

দর্শনের স্বরূপ সার্বিক ও সমন্বয়ধর্মী 

দর্শন তার আলোচ্য বিষয়বস্তুকে বিচার করে এক অখন্ড দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকৃতির বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে আলোচনা করে। তাই বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি খন্ড। কিন্তু দর্শনের কাজ হলো, বিভিন্ন বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলোর সুষম সমন্বয় সাধন করে তারই প্রেক্ষিতে জগৎ ও জীবনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা।

দর্শন ও বিজ্ঞানের পার্থক্য মাত্রাগত, স্বরূপগত নয় 

বিশ্বজগতের বিভিন্ন বিভাগ সম্বন্ধে আলোচনা-পর্যালোচনা কালে, বিজ্ঞান কিছু ধারণা বা সত্যকে বিচার না করে স্বীকার করে নেয়। দর্শন সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের যৌক্তিকতা বিচার করে দেখে। সাধারণ জ্ঞানের তুলনায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সুসংহত ও সুসংবদ্ধ। আবার বিজ্ঞানের তুলনায় দার্শনিক জ্ঞান আরও সুসংবদ্ধ, সুসংহত ও পূর্বাপর সম্পর্কযুক্ত। দর্শন দেশ, কাল, কার্যকারণ সম্পর্ক, জড়, চেতনা, মন, বিবর্তন, স্রষ্টা, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো বিচার করে এগুলোর যৌক্তিকতা নির্ণয় করে এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়।

দর্শন হলো জীবনের সমালোচনা 

দর্শন জীবনের স্বরূপ, অর্থ ও উদ্দেশ্য নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করতে চায়। আমাদের জীবনের মূল্যাবধারণ করা দর্শনের অন্যতম কাজ। দর্শন জীবনের পরম আদর্শ – সত্য, শুভ ও সুন্দর – এর যৌক্তিকতা ও স্বরূপ বিচার করে। তাই দর্শনকে বলা হয়, জীবনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। দর্শনের অন্যতম কাজ হলো, জগতের সাথে মানব জীবনের সম্পর্ক নির্ধারণ এবং বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে এমন এক সুসংবদ্ধ ধারণা দেয়া যে ধারণার সাথে মানুষের বুদ্ধিগত, নৈতিক, সৌন্দর্যগত ও ধর্ম সম্পর্কীয় চেতনার সঙ্গতি থাকে। এজন্যই বলা হয়, দর্শন হলো জীবনের সমালোচনা।

আরো পড়ুন:  বৌদ্ধবাদ বা বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে প্রাচীন ধর্মসমূহের অন্যতম একটি ধর্ম

কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস দর্শনকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে বলেন যে, দর্শন হবে জীবন ও জগৎকে বৈজ্ঞানিক এবং সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা । দর্শন হবে বৃহত্তম সংখ্যক মানুষের স্বার্থে জগৎ এবং সমাজকে পরিবর্তিত করার ভাবগত হাতিয়ার। দর্শন অবাস্তব কল্পনা নয়। দর্শন জগৎ ও জীবনের মৌলিক বিধানের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আর এই ব্যাখ্যারই অপর নাম হচ্ছে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের তত্ত্ব।

দর্শনের পদ্ধতি

দর্শন বিচারমূলক ও পদ্ধতিমূলক (Critical & methodical)। দর্শন সত্তা, জগৎ ও জীবনের সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রশ্নের সামগ্রিকভাবে আলোচনা ও মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। আর এ করতে গিয়ে দর্শন একদিকে যেমন বিচারমূলক, অন্যদিকে তেমনি সংগঠনমূলক (Constructive)। দর্শনে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি – স্বজ্ঞামূলক (Intuitive), বিশ্লেষণী (Analytic), বিচার-বিশ্লেষণী (Reflective), সংশ্লেষক (Synthetic) ইত্যাদি পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।

দর্শনের স্বরূপ ও আলোচ্য বিষয় ব্যাপক ও অনন্ত 

জগৎ ও জীবনের স্বরূপ জানার জন্য দর্শন পরম সত্তা, মূল্য, জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি নানা মৌলিক বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে। আর এই আলোচনায় দর্শন শুধু মৌলিক ধারণার পরিষ্করণ এবং মৌলিক বিশ্বাসের সমীক্ষণ করে না, বরং সংশ্লেষণের মাধ্যমে জগৎ ও জীবনের একটি সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দেয়ার ও মূল্যায়নের চেষ্টা করে। দর্শন শুধু তত্ত্বালোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, দর্শন চায় জীবন-জগতের একটা সামগ্রিক ব্যাখ্যা দিতে। এ কারণে যে কোনো গভীরতর বা মৌলিক জিজ্ঞাসা দর্শনের বিবেচ্য বিষয় হয়ে পড়ে।

উপসংহার উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দর্শনের স্বরূপ এককথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বরং সমস্ত বিষয়ের সমন্বয়েই দর্শনের স্বরূপ প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্র

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩০৯-৩১০।
২. মো. আবদুল ওদুদ, রাষ্ট্রদর্শন, ঢাকা: মনন পাবলিকেশন, দ্বিতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ২০১৪ পৃষ্ঠা ২০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!