প্লেটোর ন্যায়তত্ত্ব (ইংরেজি: Justice theory of Plato) হচ্ছে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো রচিত রিপাবলিক গ্রন্থে ন্যায় বা ন্যায্যতা সংক্রান্ত আলোচনা। প্লেটো তাঁর Republic গ্রন্থে ‘Concerning Justice’ শিরোনামে মানুষ কীভাবে ন্যায়পরায়ণ হয়ে উঠবে এবং রাষ্ট্র কিভাবে চূড়ান্ত জ্ঞানের দিকে নাগরিকদের পরিচালিত করবে -এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্ঠা করেছেন তার ন্যায়তত্ত্বের অবতারণার মাধ্যমে।
সিফালাসের পরম্পরাগত তত্ত্ব, থ্রেসিমেকাসের বৈপ্লবিক তত্ত্ব এবং গ্লুকানের বাস্তববাদী তত্ত্বের সমালোচনা করে প্লেটোর ন্যায়তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজে ও কথায় সততাই হলো ন্যায়, সত্য কথা বলা এবং অপরের ঋণ শোধ করার মাধ্যমেই ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে সিফালাস মনে করতেন। থ্রেসিমেকাস আবার ন্যায় বা সুবিচার বলতে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থতার ওপর জোর দেন। তার মতে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থ অনুসারে কাজ করে আর প্রকৃত অর্থে বলা যায় ব্যক্তির কাছে ন্যায় অপেক্ষা অন্যায় শ্রেয়, কেননা রাষ্ট্র শুধুমাত্র বলশালীদের স্বার্থের সংরক্ষণ করে থাকে। অন্যদিকে গ্লুকান আবার ন্যায় বলতে দুর্বল শ্রেণির প্রতিরক্ষার ঢালকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ গ্লুকানের মত থ্রেসিমেকাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। উল্লিখিত এই তিনটি মতকে খন্ডন করে প্লেটো ন্যায়ের ধারণাটি আলোচনা করেছেন।
প্লেটোর ন্যায়তত্ত্ব আলোচনা
প্লেটোর মতে, জীবনধারণের প্রয়োজনে মানুষ সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করে। রাষ্ট্র হলো এই সংঘবদ্ধ জীবনধারার সংগঠিত আকার। প্লেটো ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থর পরিবর্তে সমাজ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের মাধ্যমে ন্যায় বাস্তবায়িত হবে বলে মনে করতেন। যেহেতু রাষ্ট্র নাগরিকদের সম্মিলিত রূপ সেহেতু নাগরিকদের শ্রেণি চরিত্র রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। তবে প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ সামর্থ্যের ভিত্তিতে অন্যের থেকে পৃথক। নানা কাজে লিপ্ত মানুষ সম্মিলিতভাবে পৃথক পৃথক শ্রেণির জন্ম দেয় এবং চরিত্রগত দিক থেকে শ্রেণিগুলি অন্যের থেকে পৃথক। সমাজের প্রধান শ্রেণিগুলি হলো – কারিগর শ্রেণি, যোদ্ধা শ্রেণি এবং অভিভাবক শ্রেণি।
মানবসমাজের জৈবিক প্রয়োজন মেটানোই অর্থাৎ ক্ষুধার নিবৃত্তি করাই কারিগর শ্রেণির (Artiseen Class) লক্ষ্য। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মত সমস্যা সমাধানের জন্য কারিগর বা উৎপাদক শ্রেণি কর্মে নিযুক্ত থাকে। এই শ্রেণির প্রধান লক্ষ্য দৈহিক চাহিদা মেটানো। তবে দৈহিক চাহিদার পরিসমাপ্তিতেই রাষ্ট্র সীমাবদ্ধ থাকে না। নতুন নতুন শিল্প ও সাংস্কৃতিক চাহিদার উদ্ভবের ফলে নতুন পেশাজীবি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। রাষ্ট্রের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ভূখন্ডের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই অতিরিক্ত ভূ-খন্ড দখল করার জন্য এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন হয় এক বিশেষ নৈপুণ্যের। যুদ্ধ নৈপুণ্যের অধিকারী শ্রেণিটি হলো যোদ্ধা শ্রেণী (Worior Class)। এই শ্রেণীর প্রধান কাজ রাষ্ট্রের সুরক্ষা দান করা। এই শ্রেণি সাহসী, শক্তিশালী ও নিপুণ হলেও রাষ্ট্রের শাসনের জন্য এঁরা উপযুক্ত নন। তাই রাষ্ট্র শাসনের জন্য যোদ্ধা শ্রেণির মধ্যে থেকে এক নতুন শ্রেণির উদ্ভব হয়, যারা শারীরিক দিক থেকে বলশালী হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞান, বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতা সম্পন্ন। যোদ্ধা শ্রেণি থেকে উদ্ভূত এই শ্রেণির নাম অভিভাবক শ্রেণি (Gurdian Class)। এইভাবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রয়োজনে কারিগর শ্রেণি, যোদ্ধা শ্রেণি এবং শাসক শ্রেণির উদ্ভব হয়।
প্লেটোর মতে, এই তিনটি শ্রেণির সহাবস্থান স্বাভাবিক প্রয়োজনে হলেও নৈতিক প্রয়োজনেও এই সহাবস্থান প্রয়োজন। কারণ প্লেটো মনে করেন, একজন ব্যক্তি তখনই নৈতিক উৎকর্ষ লাভ করে যখন ব্যক্তির ভোগের ইচ্ছা (appetite), কর্তৃত্বের ইচ্ছা (spirit) এবং যুক্তি প্রয়োগের ইচ্ছা (reasoning) পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই উপাদানগুলির যথাযথ সমন্বয়ের ফলে মিতাচার, সাহস ও প্রজ্ঞার সৃষ্টি হয়। প্লেটোর মতে, একটি রাষ্ট্র নৈতিক দিক থেকে সর্বাপেক্ষা উৎকর্ষ তখনই হবে যখন ব্যক্তি মিতাচার, সাহস এবং প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। অর্থাৎ যে গুণগুলি রাষ্ট্রের নৈতিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে সেগুলি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির কাজকর্ম ও যোগ্যতার বিচারের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব।
এই ধারণার ওপর নির্ভর করে প্লেটো দেখিয়েছেন যে, প্রজ্ঞা শাসক শ্রেণির সঙ্গে জড়িত। শুধুমাত্র সাহস ও শারীরিক ক্ষমতা প্রয়োগ রাষ্ট্র পরিচালনার পক্ষে যথেষ্ঠ নয়, কীভাবে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ করা যায়, সে বিষয়েও যথোপযুক্ত জ্ঞানের অধিকারী বলে শাসক শ্রেণি বিচক্ষণতার সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনায় দক্ষ। সাহসের গুণটি পরিণতি লাভ করে যোদ্ধা বা সামরিক শ্রেণির কাজের মাধ্যমে। আর মিতাচারের গুণটি বিকাশের প্রধান দায়িত্ব কারিগর শ্রেণির। রাষ্ট্র নৈতিক দিক থেকে উৎকর্ষ হয়ে ওঠে শাসক শ্রেণির মাধ্যমে, সাহসী হয় যোদ্ধা শ্রেণির মাধ্যমে আয় কারিগর শ্রেণি আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে মিতাচারী করে তোলে। প্লেটো যে আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা করেছেন সেখানে এই তিনটি শ্রেণির সহাবস্থান থাকবে, প্রত্যেকে নিজ নিজ শ্রেণি ধর্ম পালন করবে। অর্থাৎ আদর্শ রাষ্ট্রটি হবে পরিবর্তনহীন। এই রাষ্ট্রের প্রজ্ঞা, সাহস ও মিতাচারের পাশাপাশি চতুর্থ গুণটি হল ন্যায় (justice)। তিনটি শ্রেণি যখন নিজ নিজ শ্রেণি অবস্থান মেনে চলে এবং অন্য শ্রেণির কাজে হস্তক্ষেপ করে না তখনই ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ প্লেটোর ন্যায়তত্ত্ব মতে, তিনটি শ্রেণির গুণের সার্থক সমন্বয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরো পড়ুন
- এরিস্টটলের বিপ্লব তত্ত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষে বিপ্লববিরোধী অবস্থানে থাকার তত্ত্ব
- এরিস্টটলের দাসতত্ত্ব হচ্ছে দাসযুগের শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমর্থনকারী মতবাদ
- এরিস্টটলের রাষ্ট্রতত্ত্ব বা এরিস্টটলীয় রাষ্ট্রের কাজ, চিন্তা, প্রকৃতি এবং সমালোচনা
- প্রাচীন গ্রিক দর্শন রোম সাম্রাজ্য এবং প্রাচীন গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর দর্শন
- সক্রেটিস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের ভাববাদী দার্শনিক
- এরিস্টটলের মতে সরকারের শ্রেণিবিভাগ হচ্ছে ছয় রকমের শাসনব্যবস্থা
- এরিস্টটলের দর্শনচিন্তা যুক্তিবিদ্যা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা এবং প্রাকৃতিক দর্শনে ব্যাপ্ত
- এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে প্রাচীন গ্রিসের এই দার্শনিকের রাজনৈতিক চিন্তাধারা
- প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র হচ্ছে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি কল্পলৌকিক সমাজ কাঠামো
- প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব হচ্ছে শাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার প্রথাহীন ব্যবস্থা
- প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্ব হচ্ছে তাঁর ন্যায় সংক্রান্ত তত্ত্বের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার শিক্ষাব্যবস্থা
- প্লেটোর ন্যায়তত্ত্ব হচ্ছে রিপাবলিক গ্রন্থে ন্যায় বা ন্যায্যতা সংক্রান্ত আলোচনা
- প্লেটোর রচনাবলী বা প্রকাশনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্ব হচ্ছে দার্শনিক প্লেটো ও তার অনুসারীদের বিকশিত জ্ঞানের তত্ত্ব
- প্লেটোর দার্শনিক চিন্তা হচ্ছে অধিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, নীতিবিদ্যা ও রাষ্ট্রনীতির সমষ্টি
- প্লেটোর একাডেমি ছিলো প্লেটো প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক আলোচনার একটি প্রতিষ্ঠান
- প্লেটো ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের প্লেটোবাদী স্কুল ও একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিক
- এরিস্টটল প্রাচীন গ্রিসের ধ্রুপদী সময়কালের একজন দার্শনিক এবং বহু জ্ঞানী
তথ্যসূত্র
১. গোবিন্দ নস্কর, রাষ্ট্রচিন্তা, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ২-৩।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚