মানবতাবাদ মানব সমাজের শ্রেণিবিভক্তিকে দেখে না

মানবতাবাদ বা মানববাদ (ইংরেজি: Humanism) হচ্ছে একটি দার্শনিক অবস্থান যা মানুষের ব্যক্তি এবং সামাজিক সম্ভাবনা এবং সংস্থার উপর জোর দেয়। এটি মানুষকে গুরুতর নৈতিক এবং দার্শনিক অনুসন্ধানের সূচনা বিন্দু হিসাবে বিবেচনা করে।

মানবতাবাদ বলতে সাধারণভাবে সমগ্র মানব-সমাজকে এককভাবে দেখা, তার শ্রেণি-বিভক্তিকে না দেখা এবং দুঃখী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটনে ব্যথিত হওয়া, দুঃখ প্রকাশ করা, সাহায্য-সহযোগিতা করাকে বোঝায়।[১] এটা এমন একটি দার্শনিক অবস্থান যা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যভাবে এবং সম্মিলিতভাবে মানুষের মূল্য এবং প্রতিনিধিত্বের উপর জোর দেয়। ক্রমবর্ধমান মনীষাগত আন্দোলন যা এর সাথে চিহ্নিত হয়েছে সেই অনুসারে মানবতাবাদ শব্দের অর্থ ওঠানামা করেছে।[২] যা হোক সাধারণভাবে, মানবতাবাদ এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা স্বীকার করে মানুষের স্বাধীনতা এবং অগ্রগতির কিছু ধারণাকে। এটি মত দেয়, ব্যক্তির উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য মানুষকে একমাত্র দায়বদ্ধ হিসাবে বিবেচিত এবং বিশ্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত মানুষের জন্য উদ্বিগ্নতার উপর জোর দেয়।[৩]

শ্রেণি বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী এই শোষণ-নিপীড়নমূলক সমাজ ব্যবস্থাকে পাল্টানোর বিপ্লবী সংগ্রাম না করে শুধুই মানবিক সহযোগিতা ও সাহায্যের মাধ্যমে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা সমাধানের চেষ্টা করা মানবতাবাদের কাজ। কিন্তু এ পথে স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। বরং বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা নেয়। এজন্য এ জাতীয় মানবতাবাদকে বুর্জোয়া মানবতাবাদ বলা হয়।

নবজাগরণের সময় এই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মানবতাবাদীরা হিউম্যানিটিজ বিষয়টিকে প্রকৃতপক্ষে মানুষ হবার শিক্ষাক্রমে পাঠ্যধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মানবজাতির সামাজিক কল্যাণ, তার সমষ্টিগত উন্নতিসাধন এবং সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা এই ধারণার আওতাভুক্ত ছিল। প্রাচীন রোমান দার্শনিক সিসেরো এবং নবজাগরণ আমলের ফ্রাঞ্চেস্কো পেত্রাকের মতো কবি, অথবা ফ্লোরেন্স শহরে আচার্য কলুচ্চিও সালুতাতির মতো পণ্ডিত এবং অন্যান্য সুলেখকদের প্রভাবে মানবতাবাদ তার ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। [৪]

আরো পড়ুন:  মানব জাতি এবং তার করণীয় প্রসঙ্গে মাওবাদ

মানবমুক্তি কাকে বলে

মানবমুক্তি বলতে বোঝানো হয় সমস্যাসমূহ থেকে পুরুষ ও নারীর মুক্তি। এটি মূলত ভাববাদী ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল যখন মানবের মুক্তি বা মোক্ষ বলতে পারলৌকিক মুক্তি বোঝাত। পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে এই মুক্তির অর্থ দাঁড়ায় মানব হিসেবে জন্মের পরে কতিপয় অধিকারের সমষ্টি। বুর্জোয়া ধারার চিন্তায় মানবমুক্তি অর্থ মানবাধিকার রক্ষার পদ্ধতি ও নীতিসমূহ।  

মার্কসবাদকে বলা হয়েছে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস লিখিত, কমিউনিজমের নীতিমালা পুস্তিকার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে এই কথা বলা হয়েছে। মার্কসবাদীদের যুক্তি হচ্ছে প্রলেতারিয়েত শ্রেণিটার মুক্তি হচ্ছে প্রধান, কারণ তারা মুক্ত না হলে মানবের মুক্তি ঘটবে না। ফলে প্রলেতারিয়েত দেখায় যে মানবমুক্তি হবে কমিউনিজম আসবার সাথে সাথে।

কমিউনিজম আসবার আগে মানবমুক্তির কথা যতদিন বলা হবে; সেটির অর্থ দাঁড়াবে বুর্জোয়া গালভরা মানবমুক্তির কথা, যেখানে শ্রেণি বৈষম্য বিরাজমান এবং আইনসিদ্ধ। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তার কমিউনিজমের নীতিমালা পুস্তিকার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে কিন্তু মানবমুক্তির কথা বলেননি; ফলে যতদিন বুর্জোয়া, পেটি-বুর্জোয়ারাও মানবমুক্তির কথা বলবে ততদিন কমিউনিস্টদের বলতে হবে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির কথা।

তবে প্রলেতারিয়েত হচ্ছে সেই মুক্তির লড়াইয়ের অগ্রণী শ্রেণি ও সেই কাজের নেতা। পেটি-বুর্জোয়ারা হচ্ছে প্রলেতারিয়েতের অনুগামী। বুর্জোয়া ও পেটি-বুর্জোয়ারা বলে খণ্ডিত মানবের মুক্তির কথা, মিথ্যেবাদী বুর্জোয়ারা নিজেদের মুক্ত থাকা এবং মুক্তভাবে লুট করার স্বাধীনতাকে লুকিয়ে রাখতে চায় মানবমুক্তির মিথ্যাচার করে।

বুর্জোয়াদের সাথে প্রলেতারিয়েতের মানবমুক্তির ধারনার পার্থক্যরেখা করা জরুরি। অর্থাৎ মার্কসবাদীদের উচিত ‘মানবমুক্তি’ না বলে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির কথা বলা শ্রেয়। কারণ মুক্তমনা, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, মানবতাবাদী এবং সুবিধাবাদী, সংস্কারবাদি, সংশোধনবাদীরা এই মানবমুক্তির কথা বলছে।

মানবতাবাদ পুঁজিবাদীদের মতবাদ। তাই “কমিউনিস্ট-বাম”রা যখন “মানব সমাজ সহ প্রকৃতিকে বাঁচানোর লড়াইয়ে স্বার্থহীনভাবে জড়িয়ে” থাকেন তখন সেটি মার্কসবাদবিরোধীই হয় যা নির্জলা মানবতাবাদীরাই বলে থাকে।

মার্কসবাদ প্রথমত শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির মতবাদ, শুরু এইখানে, শেষ হবে মানবজাতির মুক্তিতে গিয়ে। তবে পার্থক্যও থাকে কথা দুটির। কারণ মানবতাবাদীরা বলে, বুর্জোয়ারাও বলেছে তারাও মানবজাতির মুক্তি চায়। মানবতাবাদের সাথে নিজেদের পার্থক্যরেখা তৈরির জন্য এই কথাটি এসেছে। সাম্যবাদকে মানবজাতির মুক্তির মতবাদ বললে মানবতাবাদীদের পাকানো জটে সাম্যবাদীরা পেঁচিয়ে যায় বলে আমার মনে হয়।[৫]

আরো পড়ুন:  সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ

তথ্যসূত্র

১. রায়হান আকবর, রাজনীতির ভাষা পরিচয়, আন্দোলন প্রকাশনা, ঢাকা, জুন ২০২০, পৃষ্ঠা ২৫-২৬।
২. Nicolas Walter’s Humanism – What’s in the Word (London: Rationalist Press Association, 1997 ISBN 0-301-97001-7) gives an account of the evolution of the meaning of the word humanism from the point of view of a modern secular humanist. A similar perspective, but somewhat less polemical, appears in Richard Norman’s On Humanism (Thinking in Action) (London: Routledge: 2004). For a historical and philologically oriented view, see Vito Giustiniani’s “Homo, Humanus, and the Meanings of Humanism”, Journal of the History of Ideas 46: 2 (April–June 1985): 167–95.
৩. Domenic Marbaniang, “Developing the Spirit of Patriotism and Humanism in Children for Peace and Harmony”, Children At Risk: Issues and Challenges, Jesudason Jeyaraj (Ed.), Bangalore: CFCD/ISPCK, 2009, p.474
৪. অম্লান দাশগুপ্ত, “হিউম্যানিজম”, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৬৮৮-৬৯০।
৫. প্রবন্ধটি রোদ্দুরে ডট কমে ১৯ আগস্ট ২০২০ তারিখে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে লেখাটি ২৯ জুলাই ২০২২ তারিখে ফুলকিবাজ ডট কমে পুনরায় প্রকাশ করা হলো। প্রবন্ধটির রচনাকাল ১৯ আগস্ট ২০২০, নেত্রকোনা।

Leave a Comment

error: Content is protected !!