এরিস্টটলের মতে সরকারের শ্রেণিবিভাগ হচ্ছে ছয় রকমের শাসনব্যবস্থা

এরিস্টটলের মতে সরকারের শ্রেণিবিভাগ (ইংরেজি: Classification of Government) হচ্ছে সংখ্যানীতি ও উদ্দেশ্যনীতিতে বিভক্ত ছয় রকমের শাসনব্যবস্থা। এই ছয় রকমের শাসনব্যবস্থা হচ্ছে রাজতন্ত্র (Monarchy) ও স্বৈরতন্ত্র (Tyranny), অভিজাততন্ত্র (Aristocracy) ও ধনিকতন্ত্র (Oligarchy) এবং মধ্যমতন্ত্র (Polity) ও জনতাতন্ত্র (Democracy)।

আদর্শ রাষ্ট্র সম্বন্ধে এরিস্টটলের মত প্লেটোর মত হতে আলাদা। একটি রাষ্ট্রের গঠন বা সংবিধান (Constitution)-ই তার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সুতরাং রাষ্ট্রের গুণ বা দোষ মূলত তার সংবিধানের উপর নির্ভর করে। কিন্তু এ ছাড়াও একটি রাষ্ট্রের পরিবার, তার নাগরিকদের অবস্থা প্রভৃতির উপরও রাষ্ট্রের গুণ বা দোষ নির্ভর করে।

এরিস্টটলের সরকারের বা সংবিধানের শ্রেণিবিভাগ

এরিস্টটল সংবিধান ও সরকারের প্রকৃতি বিচারের মাধ্যমে তৎকালিন রাষ্ট্রের বা সংবিধানগুলির শ্রেণি বিভাজন করেছেন। শ্রেণি বিভাজনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে রাষ্ট্রের লক্ষ্যকে নির্ধারণ করেন তিনি। সংবিধানটি সাধারণভাবে জনগণের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কিনা, আবার সংবিধানটি একজনের, কতিপয়ের বা কয়েকজনের নাকি বহুসংখ্যক শাসকের স্বার্থপূরণ করে–এই নীতির ওপর ভিত্তি করে এরিস্টটল সংবিধানগুলিকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করেছেন–স্বাভাবিক এবং বিকৃত।

এরিস্টটল রাষ্ট্রের শাসকদের মূল লক্ষ্য বিবেচনা করেলে রাষ্ট্রগুলিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেন। যেসব রাষ্ট্রের শাসকেরা জনসাধারণের হিত সাধনকেই তাদের মূল লক্ষ্য বলে বিবেচনা করেন সেগুলি স্বাভাবিক বা প্রথম শ্রেণীর, আর যেগুলিতে শাসকদের মূল লক্ষ্য তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি সেগুলি হলো বিকৃত বা দ্বিতীয় শ্রেণির। স্বাভাবিক এবং বিকৃত — এই দুই বড় বিভাজনের পাশাপাশি একটি উপবিভাজন আছে, যার ভিত্তি হলো শাসকের সংখ্যা।

গঠনতন্ত্র অনুসারে প্রথম শ্রেণির রাষ্ট্রগুলিকে তিনভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে, যথা—রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্র। এগুলিকে স্বাভাবিক বা সুস্থ রাষ্ট্র বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় শ্রেণির বিকৃত রাষ্ট্রগুলিকেও তিনভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে, যথা—স্বেচ্ছাচারী একনায়কত্ব, ধনিকতন্ত্র এবং গণতন্ত্র। এগুলিকে বিকৃত (Pervert) রাষ্ট্র বলা যেতে পারে। রাজতন্ত্রের বিকৃত (Perverted) আকার (Form) হলো স্বেচ্ছাচারী একনায়কত্ব, অভিজাততন্ত্রের বিকৃত আকার হলো ধনিকতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্রের বিকৃত আকার হলো গণতন্ত্র।

আরো পড়ুন:  প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্ব হচ্ছে দার্শনিক প্লেটো ও তার অনুসারীদের বিকশিত জ্ঞানের তত্ত্ব

রাজতন্ত্র: যে রাষ্ট্রে বিদ্যা, বুদ্ধি,কর্মদক্ষতা এবং চারিত্রিক গুণে অপর সকল নাগরিক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একজন মাত্র নাগরিকের হস্তে চরম শাসন ক্ষমতা থাকে সেই রাষ্ট্র হলো রাজতন্ত্র এবং ঐ ব্যক্তি হলেন রাজা। এরিস্টটলের মতে রাজতন্ত্র হলো আদর্শ রাজতন্ত্র কিন্তু সফল হতে গেলে রাষ্ট্রে এমন এক ব্যক্তির থাকা প্রয়োজন যিনি সেই রাষ্ট্রের অপর সকল ব্যক্তি অপেক্ষা সব বিষয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু অধিকাংশ রাষ্ট্রেই এই শর্ত পূর্ণ হওয়া অসম্ভব। যে রাষ্ট্রে বাস্তবিক এরূপ ব্যক্তি নাই অথচ একজন কুশলী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির হস্তে শাসন-ক্ষমতা আছে সেই রাষ্ট্রের প্রজারা অনেক দুঃখ ভোগ করে।

অভিজাততন্ত্র: যে রাষ্ট্রে বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও সৎ ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত শাসক-মণ্ডলীর হস্তে চরম শাসন-ক্ষমতা থাকে তা হলো অভিজাততন্ত্র। শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে রাজতন্ত্রের পরই অভিজাততন্ত্রের স্থান। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রে আদর্শ শাসক হবার উপযুক্ত বহুসংখ্যক ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাওয়া খুবই কঠিন অথবা অসম্ভব। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে এরূপ রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্তই অল্প। অভিজাততন্ত্রের বিকৃত রূপ হলো ধনিকতন্ত্র।

প্রজাতন্ত্র: প্রজাতন্ত্র (Polity) হলো সেই রাষ্ট্র যেখানে সাধারণ বিদ্যা-বুদ্ধি সম্পন্ন মধ্যবিত্ত ব্যক্তিদের হাতে শাসন-ক্ষমতা থাকে এবং তারা অন্য ব্যক্তিদের শাসন করতে এবং অন্যদের দ্বারা শাসিত হতে প্রয়োজনানুসারে সমানভাবেই প্রস্তুত থাকেন। প্রজাতন্ত্রের বিকৃত আকার হলো গণতন্ত্র। এরূপ রাষ্ট্রে বিদ্যাবুদ্ধিহীন বহু ব্যক্তি কেবলমাত্র সংখ্যার জোরে সকলের উপর আধিপত্য স্থাপন করে এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সকলের উপর অত্যাচার করে। উল্লেখ্য এরিস্টটল Democracy শব্দটিকে এই প্রসঙ্গে যে অর্থে ব্যবহার করেছেন তা বর্তমান কালের অর্থ হতে ভিন্ন।

ধনিকতন্ত্র হলো সম্পদশালী শ্রেণীর সরকার, গণতন্ত্র হলো গরিবের সরকার। রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্র আদর্শ স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা হলেও তার মতে পলিটি বা প্রজাতন্ত্রই হলো বাস্তব উপযোগী। এই শাসনব্যবস্থা শাসনতন্ত্র এবং সামাজিক ভিত্তির দিক থেকে মাঝামাঝি অবস্থান করে। গণতন্ত্র এবং ধনিকতন্ত্রের মিশ্রিত রূপ হলো পলিটি।

আরো পড়ুন:  প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব হচ্ছে শাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার প্রথাহীন ব্যবস্থা

নগর রাষ্ট্রের প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনাতে এরিস্টটল মধ্যম মানের নীতি অবলম্বন করেছেন। রাষ্ট্রকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে গেলে জনসংখ্যা ও ভূখন্ড মাঝারি আকৃতির হওয়া প্রয়োজন। আকৃতি এত বড় হবে না যে সুশাসন অসম্ভব হয় আবার এত ছোটও হবে না যাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া কঠিন হয়ে যায়। আবার সুশাসন দেবার পক্ষে যতটা জনসংখ্যা দরকার ততটাই থাকা উচিত।[২]

উপসংহার

বাস্তব অবস্থার দিকে দৃষ্টি রাখলে আমাদের নিশ্চয়ই বলা উচিত যে, সেই সময়ের বিবেচনায় এসব চিন্তার মাঝে যথেষ্ট ভুল বিরাজিত ছিল। এরিস্টটল রাষ্ট্রের প্রকৃতি, রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাগ, আদর্শ রাষ্ট্র প্রভৃতি সম্বন্ধে যে সব মত প্রচার করেছিলেন বর্তমান কালের রাষ্ট্রচিন্তায় তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই কোনো স্থান নাই বললেই চলে, কিন্তু তার কয়েকটি মতের গুরুত্ব এখনও পর্যন্ত অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তিই স্বীকার করেন। ইহাও লক্ষণীয় যে, এরিস্টটল সেকালের দার্শনিকদের মধ্যে অতি উচ্চ স্থান অধিকার করলেও কোনো কোনো বিষয়ে বদ্ধমুল কুসংস্কারের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন নি। ক্রীতদাসদের সম্বন্ধে তিনি যেসব কথা বলেছেন তাতেই এই প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যাবে।

তথ্যসূত্র

১. ড. কল্যাণ চন্দ্র গুপ্ত, পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ ১৯৯০, পৃষ্ঠা ৯৮-১০০
২. গোবিন্দ নস্কর, রাষ্ট্রচিন্তা, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ১১-১২।

Leave a Comment

error: Content is protected !!