সাহিত্যের শৈলি হচ্ছে কোনো লেখকের দ্বারা কোনো গল্প লেখা অথবা বলার উপায়

শৈলি বা শৈলী বা সাহিত্যের শৈলি (ইংরেজি: Styles of Literature) হচ্ছে যখন সাহিত্যে কোনো লেখকের দ্বারা কোনো গল্প লেখা অথবা বলা হয় তার উপায়। এটিই একজন লেখককে অন্যের থেকে আলাদা করে তোলে এবং “কণ্ঠস্বর” তৈরি করে যা শ্রোতারা যখন পড়েন তখন শুনেন। অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে যেগুলো একত্রে লেখকের শৈলি তৈরি করে; সেই অংশগুলো হচ্ছে স্বর, শব্দ পছন্দ, ব্যাকরণ, ভাষা, বর্ণনামূলক কৌশল ইত্যাদি। শৈলি কোনোও সাহিত্যের অংশগুলোর মেজাজ নির্ধারণ করে, তাই সাহিত্যের সমস্ত ধরন জুড়ে এর গুরুত্ব বিশাল। বিভিন্ন ধরণের সাহিত্যের জন্য বিভিন্ন শৈলির প্রয়োজন হয়, এবং বিভিন্ন শৈলিতে বিভিন্ন লেখকের প্রয়োজন হয়।[১]  

অর্থাৎ শৈলি হচ্ছে লেখকের শব্দ সাজানোর স্বতন্ত্র ধরন, যাতে তাঁর ধারণা ও লেখার উদ্দেশ্য সাধিত হয়। শৈলীর উপাদানগুলির মধ্যে শব্দবিন্যাস (syntax), শব্দ-নির্বাচন, স্বর, আলংকারিক ভাষা, চিত্রকল্পসমূহ, (Imagery), দৃষ্টিকোণ বা পয়েন্ট অফ ভিউ, গঠন প্রক্রিয়া, গীতময়তা, ছন্দ, সময়ের ব্যবহার, পুনরাবৃত্তি অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমান পাঠে সাহিত্য রচনার শৈলি বলতে সাহিত্যের অবয়বধর্মের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও রূপ আলোচিত হবে। এক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য আঙ্গিকের ধারণা ও মতবাদের বিশ্লেষণ স্থান পাবে। 

আমাদের চার পাশের দেখা জগৎ প্রধানত দৃশ্যময় ও চিত্রময়। অর্থাৎ বিশ্বজগৎ আমাদের কাছে ধরা দেয় তার রূপ নিয়ে। মানুষ, প্রকৃতি-নদী-বৃক্ষ-সমুদ্র — সবকিছুই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে স্ব-রূপে। সেই রূপ প্রত্যক্ষ করার পর বিচিত্র অনুভূতি, কল্পনা ও স্বপ্নের জন্ম হয় মানুষের মনে। বাইরের জগৎ ও জীবনের যে সব উপাদান সাহিত্য স্রষ্টার মানসলোকে সঞ্চিত হতে থাকে, সেগুলো সৃষ্টির এক অনুকূল পরিবেশ রচনা করে। এই সৃষ্টিই সাহিত্য। 

সাহিত্য উপভোগ ও বিচারের ক্ষেত্রে ভাব বা মূল বিষয় এবং শৈলি বা প্রকাশভঙ্গি শব্দ দুটি আমরা প্রায়শ ব্যবহার করি। এই ভাব ও শৈলির পরম ও অনিবার্য মিলনই হলো সাহিত্য। আমরা সাহিত্যিকের যে-সৃষ্টি উপলব্ধি করি, রস আস্বাদন করি – তা প্রকৃতপক্ষে ভাব ও শৈলির অখণ্ড এক সৃষ্টি। কোনোটিকেই আলাদা করে বিচার করা যায় না। দার্শনিক ক্রোচের মতে শিল্পের প্রথম প্রকাশ ঘটে, শিল্পীর মনোলোকে। আর এই প্রকাশ কল্পনার সাহায্যে বাইরের জগৎ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা বা প্রত্যয়সমূহের আকৃতি বা অবয়ব লাভ। ভাব ও শৈলি এভাবেই হয়ে ওঠে অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু আলোচনার সুবিধার জন্য আমরা ভাব ও শৈলির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করি। ভাব ও শৈলির অনিবার্য মিলনে যে আনন্দময় উপভোগের অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তাকেই বলা হয় রস। ভাবের মতো শৈলি বা প্রকাশভঙ্গিও সাহিত্যের উপকরণ।

আরো পড়ুন:  সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির লিখিত অথবা মুদ্রিত বিষয়

মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত যে-কোনো বিষয় ভাব- শৈলির উপাদান হতে পারে। এই ভাব বাস্তব জগতের সঙ্গে সাহিত্যিক বা শিল্পীর সংস্পর্শ থেকে সৃষ্টি হতে পারে; বা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাণ থেকে আসতে পারে অথবা পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কল্পনায় উদিত হতে পারে। তাই ভাব বিচিত্র। কখনো চিন্তা, কখনো অনুভব, কখনো বা স্মৃতি হয়ে এই সব উপকরণ সাহিত্যিকের মনকে অধিকার করে। জগৎ ও জীবনের অভিজ্ঞতা সাহিত্যিকের মানসসম্পদ হলেও শৈলির মাধ্যমেই তাকে প্রকাশ করতে হবে। একজন পাশ্চাত্য সমালোচক উইলিয়াম হেনরি হাডসন সাহিত্যের শৈলি ও রীতিকে অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর মতে প্রতিটি সাহিত্য শৈলির বিন্যাস, সামঞ্জস্য, সৌন্দর্য এবং কার্যকারিতা নির্ধারিত নীতি বা আদর্শ অনুসারে সৃষ্টি করতে হবে। এই নীতির ভিত্তিতেই সাহিত্যের প্রযুক্তিগত কিংবা শৈলীগত উপাদান স্বীকৃতি লাভ করে। 

এ-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবেচনার শরণ নেয়া যেতে পারে। সাহিত্য, সাহিত্যের সামগ্রী, সাহিত্যের তাৎপর্য প্রভৃতি বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের শৈলি ও রসবৈচিত্র্যের প্রবণতাসমূহ শনাক্ত করেছেন। তাঁর মতে, সাহিত্যের প্রধান অবলম্বন জ্ঞানের বিষয় নয়, ভাবের বিষয়। আর এই ভাবজগৎ গড়ে ওঠে ‘মানব হৃদয়’ ‘মানবচরিত্র’ ও ‘বহিঃপ্রকৃতি’কে আশ্রয় করে। বাইরের এসব উপাদান শিল্পীর মনে ‘হৃদয়ভাব’ জাগ্রত করে। কিন্তু এই হৃদয়ভাবের সার্থকতা প্রকাশের মধ্যে, অন্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত করার মধ্যে। অন্যের হৃদয়ে সঞ্চার করতে হলে তার শৈলি-সৌন্দর্য ও কলাকৌশলে পরিপূর্ণতা থাকতে হবে। রবীন্দ্রনাথের মতে ‘কলাকৌশলপূর্ণ’ রচনা ভাবের দেহের মতো। এই দেহের মধ্যে ভাবের প্রতিষ্ঠায় সাহিত্যিকের পরিচয়।

আমরা সাহিত্যের যে-সব আঙ্গিকের কথা জানি, প্রত্যেকটি আঙ্গিককে সার্থক হতে হলে কলাকৌশলের অনিবার্য ব্যবহার থাকতে হবে। সাহিত্য-সৃষ্টি বলতে আমরা ভাব ও ভাবপ্রকাশের উপায় বা পদ্ধতি উভয়ই বুঝি। এই উপায়টি হচ্ছে শৈলি; ভাব হচ্ছে রসের উৎস। ভাবকে যথার্থ রূপে প্রকাশ করতে হলে প্রাসঙ্গিক রসেরও প্রয়োগ ঘটাতে হবে। 

আরো পড়ুন:  প্রবন্ধ সাধারণত এক টুকরা লেখা যা লেখকের নিজস্ব যুক্তি দেয়

সাহিত্যের ধরন বা প্রকারভেদ বা প্রকাশভঙ্গির আলোচনা প্রসঙ্গে সাহিত্যের শৈলী বা স্টাইলের কথা এসে পড়ে অনিবার্যভাবে। ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রে ইংরেজি স্টাইল-এর অনুরূপ যে-শব্দটি আদিকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সে শব্দটি হচ্ছে ‘রীতি’। অলঙ্কার শাস্ত্রবিদ আচার্য বামন বলেছেন, ‘রীতি’ হলো ‘পদরচনার বিশিষ্ট ভঙ্গি’ এবং রীতিই হচ্ছে কাব্যের আত্মা – ‘রীতিরাত্মা কাব্যস্য’। তাঁর মতে মাধুর্য, ওজঃ, প্রসাদ প্রভৃতি গুণে কাব্য বিশিষ্টতা পায়। কাব্যের আত্মা হলো রীতি আর রীতির আত্মা হলো গুণ। আচার্য কুন্তল বলে আর এক ভারতীয় কাব্যতাত্ত্বিক রীতিকে কেবল সাজসজ্জা মনে করেননি। তাঁর মতে রীতি বা প্রকাশভঙ্গি একজন কবির আন্তঃ-স্বভাবকেই প্রকাশ করে। 

পাশ্চাত্যের সাহিত্যভাবনায় স্টাইলকে বিচিত্রভাবে দেখা হয়েছে। প্লেটো এবং তাঁর অনুসারীরা ভাব ও ধরনের পরম মিলনকেই স্টাইলের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যে-ভাবটি কোনো স্টাইলের মধ্য দিয়ে ‘অনিবার্যতা’ পায়, সেটাই স্টাইলের সার্থকতা। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটির ভাববস্তুর সঙ্গে তার স্টাইলের সম্পর্ক অনিবার্য। এ-কবিতার স্টাইল অন্যরকম হলে এর ভাব বা বিষয় পরিপূর্ণতা পেতো না। অ্যারিস্টটল ও তাঁর অনুসারীদের মতে স্টাইল কোনো গুণ নয়, অনেকগুলো উপাদানের ফল। এই ধারণা পরবর্তীকালে আরও বিচিত্র রূপে প্রকাশ পেয়েছে। স্টাইলকে সাতটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে।

১. লেখকের নাম-অনুযায়ী স্টাইল। যেমন:

শেক্সপীয়রের শৈলি
রবীন্দ্রনাথের শৈলি 

২. কালের দিক থেকে। যেমন:

মধ্যযুগীয় শৈলি
আধুনিক শৈলি  

৩. ভাষার বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে। যেমন:

জার্মান শৈলি
বঙ্গীয় শৈলি  

৪. অঞ্চলভিত্তিক স্টাইল। যেমন:

গ্রীক শৈলি
এশীয় শৈলি 

৫. জনসাধারণের রুচি অনুযায়ী। যেমন:

জনপ্রিয় শৈলি  

৬. বিষয় অনুযায়ী স্টাইল। যেমন:

বৈজ্ঞানিক শৈলি
ঐতিহাসিক শৈলি
নীতিমূলক শৈলি 

৭. উদ্দেশ্য অনুযায়ী স্টাইল। যেমন:

ভাবপ্রবন শৈলি
ব্যঙ্গাত্মক শৈলি  

এভাবে স্টাইল বা প্রকাশভঙ্গি সাহিত্যবিচারের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। ক্লাসিক্যাল বা রোমান্টিক স্টাইলের ধারণানীতিও এ-জাতীয় মানসিকতা থেকে উদ্ভূত। যেমন হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’কে ক্লাসিক স্টাইলের কাব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার জন কীটস্-এর ‘এন্ডোমিয়ন’ কিংবা ‘হাইপেরিয়ন’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘বলাকা’ কিংবা অন্যান্য কাব্যগুলো রোমান্টিক স্টাইলের স্বভাবধর্ম লালন করে। ক্লাসিক স্টাইল বলতে বুঝি সুস্পষ্টতা (Objectivity) আর রোমান্টিক স্টাইল হলো ব্যক্তির ভাবময় (Subjective) জীবনানুভবের রূপায়ণ।

আরো পড়ুন:  প্রবাদ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উপলব্ধি করা সত্যকে মূর্তভাবে প্রকাশ করে

তথ্যসূত্র

১. Unknown, “Style”, Literary Terms, সংগ্রহের তারিখ: ১০ জানুয়ারি, ২০২১, links: https://literaryterms.net/style/

Leave a Comment

error: Content is protected !!