সংস্কৃতি কী? এটা মানুষ ও সমাজের রূপান্তরমূলক ক্রিয়া ও ফলাফলের সমষ্টি

সংস্কৃতি কী? সংস্কৃতি বা কৃষ্টি (ইংরেজি: Culture) হচ্ছে মানুষ ও সমাজের সকল ধরনের রূপান্তরমূলক ক্রিয়াকলাপ এবং এ সকল ক্রিয়াকলাপের ফলাফলের সমষ্টি। সংস্কৃতি মানুষের জীবনধারা ব্যবহারগত ও রূপান্তরগত রূপের প্রতিফলন। সমাজের ঐতিহাসিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সমাজের মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়তই ঐ সমাজের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের মধ্যে বেড়ে উঠি। সংস্কৃতির কারণেই মানুষের ব্যক্তি জীবন এবং সমাজ জীবন অন্য প্রাণীদের থেকে স্বতন্ত্রতা পায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সমাজগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। প্রতিটি সংস্কৃতিরই রয়েছে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য। মূলত অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভিন্নতা এবং এর সাথে খাপ খাওয়ানোর ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও উপকরণের কারণে সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিজস্ব হয়ে থাকে।[১]

সংস্কৃতি দুই রকমের হতে পারে, বৈষয়িক এবং মানসিক। বৈষয়িক সামগ্রী ও সেগুলির উৎপাদনের উপায় প্রথমটির অন্তর্গত। দ্বিতীয়টির মধ্যে পড়ে সমগ্র জ্ঞান ও সামাজিক চেতনার সমষ্টি – দর্শন, বিজ্ঞান, নৈতিকতা, আইন, কলা, ইত্যাদি। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে মানুষের কর্মকাণ্ডের মূলে রয়েছে তার বৈষয়িক বা উৎপাদনমুখী ক্রিয়াকলাপ। অন্যদিকে তার চিন্তাভিত্তিক কার্যকলাপ বস্তুরূপ ধারণ করে, জিনিসে, প্রযুক্তির উপায়ে, শিল্পকর্মে রূপান্তরিত হয়। সংস্কৃতির শিখর ইতিহাসের গভীরে এবং মানুষের উদ্ভবের সাথে জড়িত। সংস্কৃতির বিকাশ মানুষ কর্তৃক প্রকৃতির শক্তিকে বশের মাত্রা, খোদ মানুষের বিকাশের স্তর, তার জ্ঞানের পরিসীমা, ক্ষমতার উৎকর্ষের মাত্রা ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হয়।[১]

সংস্কৃতি সর্বপ্রকার বৈষয়িক এবং মানসিক সৃজন ও সম্পদের ব্যাপক অর্থবহ শব্দ। অনেক সময় সাহিত্য, শিল্প, দর্শন, সামাজিক আচরণ ও নীতি—অর্থাৎ মানুষের ভাবগত সৃষ্টিকর্মকে কেবল সংস্কৃতি বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মানুষের সৃষ্টির সম্পূর্ণ অর্থে আর্থিক ও কারিগরি সৃজন কর্ম এবং তার ফসল অর্থাৎ উৎপাদনের যন্ত্র, কলকারখানা এবং উৎপাদিত বৈষয়িক সম্পদ ও সৌধকেও একটা মানব সমাজের সংস্কৃতি হিসাবে গণ্য করা উচিত। পার্থক্য হিসাবে ভাবগত সৃষ্টিকে মানসিক সংস্কৃতি এবং দেহগত সৃষ্টিকে বৈষয়িক সংস্কৃতি বলে চিহ্নিত করা চলে। কিন্তু এরূপ পৃথকীকরণও কেবলমাত্র আপেক্ষিকভাবে স্বীকার্য। মানসিক ও বৈষয়িক সংস্কৃতির মধ্যে কোনো চরম পার্থক্য বা বিরোধের অবকাশ নাই। কোনো মানসিক সংস্কৃতি দেহ এবং বৈষয়িক অবস্থা-নিরপেক্ষভাবে সৃষ্টি হতে পারে না। আবার কোনো বৈষয়িক কর্মই মনের কল্পনা বাদে সাধিত হতে পারে না।[২]

আরো পড়ুন:  ইতিহাস বস্তুর বিকাশের চেতনানিরপেক্ষ প্রক্রিয়া যা বাস্তবে সংঘটিত ও লিখিত

সংস্কৃতি কী সামাজিক সৃষ্টি? সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে মানুষের ব্যক্তিগত এবং যৌথ ক্রিয়া-কাণ্ডের ফলেই সংস্কৃতির উদ্ভব। এ কারণে সমাজ-সংগঠনের বিশিষ্ট রূপ দ্বারা সমাজের সংস্কৃতির রূপ প্রধানত নির্দিষ্ট হয়। এক সমাজ থেকে আর এক সমাজের সংস্কৃতি এই ভিত্তিতেই পৃথক হয়। আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের সমাজের ইতিহাস শ্রেণিভেদের অবস্থাহীন আদিম সাম্যবাদী সমাজ এবং তারপরে শ্রেণীভেদ-সম্পন্ন দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ এবং পুঁজিবাদী সমাজ হিসাবে এ পর্যন্ত বিভক্ত হয়েছে। এই পর্যায় মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাসকেও দাস সমাজের সংস্কৃতি, সামন্ত সমাজের সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কৃতি বলে চিহ্নিত করা হয়।

সংস্কৃতি কী বিষয়ে ইউটিউবে আলোচনা দেখুন

আলোকচিত্রের ইতিহাস: নিবন্ধে ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যায় জনপ্রিয় ছৌ নাচের দৃশ্য। ফটোটি তুলেছেন Ujjal.das84 CC-BY-SA-4.0.

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, “সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষ ও সমাজের রূপান্তরমূলক ক্রিয়া ও ফলাফলের সমষ্টি”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/literature/on-culture/
২. সোফিয়া খোলদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ৬২।
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১১৯-১২০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!