আধুনিক ফিলিপাইনের ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদের পরস্পরবিরোধী গতিশীলতার প্রভাব

আধুনিক ফিলিপাইনের ইতিহাস (ইংরেজি: History of the modern Philippines) হচ্ছে যথার্থভাবে সাম্রাজ্যবাদের পরস্পরবিরোধী গতিশীলতার প্রভাব। স্প্যানিশ, উত্তর আমেরিকান, এবং জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা, সেইসাথে তাদের উত্তর-ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারী হিসেবে ফিলিপাইনে প্রজাতন্ত্র সামাজিক জীবনের উপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, তবুও তারা যে নতুন ধরনের জীবন তৈরি করেছিল তার দ্বারা নিজেদেরকে অবমূল্যায়িত এবং পরাস্ত বলে মনে হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদেরর এই দ্বান্দ্বিক আন্দোলনকে আমরা ফিলিপাইনের ইতিহাসে স্পষ্টভাবে আলোকিত দেখতে পাই।

আধুনিক ফিলিপাইনের ইতিহাস আরম্ভ হয়েছে ২৩ জানুয়ারী, ১৮৯৯ তারিখে, যেদিন এশিয়ার প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধানের অধীনে প্রথম ফিলিপাইন প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়েছিল, যার রাষ্ট্রপতি ছিলেন আগুইনালদো। তার আগের বছরে ২০ মিলিয়ন ইউ এস ডলারের বিনিময়ে স্পেন ১৮৯৮ সালে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দেয় ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জকে! একই বছরে দেশটি প্রথম রিপাবলিক সরকার গঠন করলেও স্পেনের এই অমানবিক আচরণে সহজেই অনুমেয় হয় যে এত সহজে স্বাধীনতার স্বাদ তারা পাবে না।

১৮৯৯ সালেই উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিলিপাইনবাসী। দীর্ঘ তিন বছর এক মাস দুই দিনের এই যুদ্ধে ফিলিপাইনকে পরাজিত করে গোটা দেশটিকে কুক্ষিগত করে নেয় আমেরিকা। আমেরিকা নানা শোষণ-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে ফিলিপাইনকে নিজেদের একটি অলিখিত উপনিবেশিক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করতে লাগল। আমেরিকার সুবিধামতোই ফিলিপাইন তথাকথিত রিপাবলিক সরকার গঠিত হতে লাগল। এই টানাপড়েনের মধ্যেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৪৬ সালের ৪ জুলাই জাপানের সহযোগিতায় সর্বপ্রথম দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই স্বাধীন দেশটির সামনে তখন অসংখ্য সমস্যা কিন্তু কোনো কিছুরই যখন যথাযথ সুরাহা পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন স্পষ্ট হতে লাগল যে ক্ষমতাসীন দল পরোক্ষভাবেও আমেরিকার হয়েই কাজ করছে। ফিলিপাইনের আপামর জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি বা স্বাধীনতা তখনো অনেক দূর। তৎকালীন সেই বিরাজমান পরিস্থিতিতে তরুণ প্রজন্ম ও নবীন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ তীব্র আকার ধারণ করে।

আরো পড়ুন:  বিপ্লব সম্পর্কে তত্ত্ব কয়েক ধরনের তত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা

ফিলিপাইনের জনগণের দেশপ্রেমের তাগিদেই ১৯৬০ সালে ‘নিউ পিপলস আর্মি (এনপিএ) নামে একটি গেরিলা দলের অভ্যুত্থান ঘটে। দলটি মূলত ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য ফিলিপিন (সিপিপি)’-এর আর্মড উইং। তাঁদের মূল আদর্শ হচ্ছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাওবাদ। ১৯৬৯ সালের ২৯ মার্চ ৭২ জন যোদ্ধা ও হালকা অস্ত্র নিয়েই দেশপ্রেমের তাগিদে প্রথম মিশনে নামেন ‘প্রোলেতারিয় বিপ্লব’ কায়েম করতে চাওয়া এই গেরিলা দলটি।

ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীতে নিয়োজিত আমেরিকান কর্নেল জেমস এন রোইয়েকে হত্যার মধ্য দিয়েই দলটি তার আত্মপ্রকাশ করে। এই ঘটনার পর যুক্তরাজ্য ও আমেরিকা দলটিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দলের তকমা লাগালেও দেশের মানুষ তাদের সমর্থন করে যাচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে। এমনকি তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা ও সামরিক সহায়তাও আসে দেশটির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। বার্নাব বাস্কায়ানোর নেতৃত্বে গঠিত এই গেরিলা দলটি এখনো সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস

১৯৩০ সালের ৭ ডিসেম্বর ক্রিস্টানো এভানজিলিস্টা’র নেতৃত্বে ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন পার্টির নাম হয় ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টি আইসল্যান্ড (সংক্ষেপে সিপিপিআই)। মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে পার্টির তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গোপন পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে শ্রমিক কৃষকদের মধ্যে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলে। অন্যদিকে পেডরো এ্যাট স্যান্টোসের নেতৃত্বে সোশালিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইন (এসপিপি) নামে অন্য একটি পার্টি গঠিত হয়। ১৯৩৮ সালে এই দুই পার্টি ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি) নামে ঐক্যবদ্ধ হয়। এই পার্টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী কার্যক্রমে ডান-বাম সুবিধাবাদী বিচ্যুতির প্রক্রিয়ায় ১৯৬৮ সালের এপ্রিলের দিকে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এবং ১৯৭৪ সালের মধ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল মার্কোসের এজেন্টে পরিণত হয়।

অতঃপর পুরনো সিপিপি’র সংশোধনবাদী লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় কমরেড এমাডো গুররিওর নেতৃত্বে মাও সেতুংয়ের জন্মবার্ষিকী ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৬৮ সালে ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি) পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীতে এই পার্টির প্রধান নেতৃত্বে আসেন কমরেড জোসে মারিয়া সিসন। এই নতুন সিপিপি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। প্রথম থেকেই এ পার্টি সশস্ত্র সংগ্রাম তথা গণযুদ্ধের লাইনকে আঁকড়ে ধরে। সেজন্য ১৯৬৯-এর ২৯ মার্চ পার্টির নেতৃত্বে নিউ পিপলস আর্মি (এনপিএ) নামে বাহিনী গঠন করে। এরপর ১৯৭৪ সালের ২৪ এপ্রিল জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামে ফ্রন্ট গড়ে তোলে।

আরো পড়ুন:  বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে

পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান হচ্ছেন আরমান্ডো লিয়ানগ। কমরেড সিসন নেদারল্যান্ডে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে এনডিএফপি’এর প্রধান কনসালটেন্ট হিসেবে ফিলিপাইনের নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সপক্ষে ভূমিকা রাখছেন।

২০১১ খ্রিস্টাব্দে এই মাওবাদী পার্টি এক বিবৃতিতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ক্ষমতা দখলের একটি রণনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী বিভিন্ন ধরনের জোট গড়ে তুলেছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!