শব্দ শ্রমিক অনুপ সাদি

  • পিনাক বিশ্বাস, গবেষক ও লেখক

– ইন্ডিয়া আইছি, কাইল। কখন দেখা করবেন?
– ইন্ডিয়া একটুখানি দেশ নয় সাদি ভাই, বলুন কলকাতা এসেছেন।

আদি অকৃত্তিম অনুপ সাদি। কলকাতা এলে হাজার কাজের ফাঁকে আমার সাথে তার দেখা করা চাই-ই। যাদবপুরে এইট বি কলোনি, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউস, ব্যাঙ্গালোরে উইকিপিডিয়ার সার্ক সম্মেলন, ইন্ডিয়ান কফি হাউস, কিংবা দমদমের ফুটপাত এরকমই অজস্র অদ্ভুত, কিংভুত জায়গায় আমাদের মোলাকাৎ হয়েছে। প্রায়শই আমাদের মধ্যে উপস্থিত থেকেছেন দোলন প্রভা, যিনি সাদি ভাইয়ের সুযোগ্য ভ্রমণসঙ্গী। 

অনুপ সাদির সাথে আমার পরিচয় তার গবেষণাধর্মী লেখালেখি বা রাজনৈতিক মতাদর্শের জায়গা থেকে নয়। উইকিপিডিয়ার কর্মসূত্রে। সারা পৃথিবীর কত শত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের জীবনী যে তিনি বাংলা উইকিপিডিয়াতে নিয়ে এসেছেন তার ইয়ত্তা নেই। নিরলসভাবে বই ঘেঁটে ঘেঁটে রেফারেন্স যোগাড় করে একের পর এক নিবন্ধ লিখে গেছেন, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে, বাংলা বিশ্বকোষকে সমৃদ্ধ করতে। যেহেতু দুজনেই জীবনীভিত্তিক নিবন্ধ তৈরি করতাম তাই আলাপ হৃদ্যতায় গড়াতে সময় নেয়নি। আর এই প্রবলতর আন্তর্জালিক যুগে কাঁটাতারের বেড়া বিন্দুমাত্র বাধা হয়নি আমাদের।

মৃণাল সেন কোথাও একটা লিখেছিলেন ‘স্মৃতিচারণটা বুড়ো বয়সের লক্ষণ, অথবা বুড়োটেপনা’। আমাদের বয়েস বাড়ছে, প্রতিটি মুহুর্তে একটু একটু করে বুড়ো হচ্ছি, তবে এই ছোট্ট (ছোট্ট ছোট্ট সময় কাটানোর ফল) লেখাটা স্মৃতিচারণ-ফারন একেবারেই নয়, প্রশ্নই নেই। ভদ্রলোককে যতটুকু দেখেছি, ঠিক ততটুকুই লিখে রাখা। পরিবর্তনই একমাত্র সত্য, এই থিওরি মেনে আগামিতে আরো মিশব, আরো জানবো, আজকের, এই মুহুর্ত অব্দি জানাটুকুর সাথে তার বিস্তর ফারাক থাকবে। কিংবা থাকবে না।

যেখানে রাজনীতি সংক্রান্ত লেখালিখির কারণে সারা বাংলাদেশের প্রাবন্ধিক মহলে তিনি পরিচিত, সেথায় আমাদের আলোচনাও কখনো রাজনীতি বর্জিত হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। বেশ বোঝা গেছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল আর তাই নিয়ে পঠনপাঠনে অভ্যস্ত। ভারতের বহু জায়গা পরিভ্রমণ করেছেন, ছবি তুলেছেন, সেইসব চিত্র আবার ইন্টারনেট জগতে বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। আমার নিজের দেশের বহু জায়গা চিনেছি ভিনদেশি একজন লেখকের কলমে, এ এক মহা রগড়ের ব্যাপার বইকি।

প্রকৃতিগতভাবে আমি কিছুটা নৈরাজ্যবাদী ও অবিন্যস্ত হওয়ার জন্য যে কোনো ধরনের অর্থোডক্স, ডগম্যাটিক ভাবনাচিন্তা থেকে কিঞ্চিত দূরে অবস্থান করি। তবুও কোনোভাবেই তা আমাদের বন্ধুত্বে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। প্রথম আলাপের দিনটিতে উনি আমায় উপহার দেন তার লেখা দু-খানি বই, সমাজতন্ত্র আর মার্কসবাদ। আর আমার নিন্দুকেরাও স্বীকার করেন আমি ভোরাসিয়াস রিডার, যাকে গোদা বাংলায় বলে রাক্ষুসে পাঠক। অল্প সময়ের মধ্যেই এই বই দুখানি পড়ে ফেলি, এবং বুঝি যে সেথায় মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ও একেবারে মৌলিক বিষয়গুলি সহজ, প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন প্রাবন্ধিক সাদি। পরে যখন জানলাম এ ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আর এমন গভীর থেকে গভীরতর লেখালেখি করেন তখন রীতিমত সমীহ জেগেছে।

এপার বাংলার খ্যাতনামা সম্পাদক ও প্রাবন্ধিক সমীরণ মজুমদার মহাশয়ের সাথে আমার আলাপ ওপার বাংলার সাদির সূত্র ধরে। করোনাকালের অনেকদিন আগে ঘটে যাওয়া সেই আলাপচারিতায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কবি ও নাট্যকার হাসান ফকরী মহাশয়। স্বীকার করতে লজ্জা বোধ করছি না, আমি সমীরণবাবু সম্পাদিত ও লিখিত একাধিক বইকে তথ্যসূত্র হিসাবে ব্যবহার করলেও, ভদ্রলোকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না। উল্লেখ থাকে সমীরণ বাবু প্রয়াত হওয়ার আগে অব্দি নিয়ম করে তার পত্রিকা আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে গেছেন, একটিবারের জন্যেও অন্যথা হয়নি। কলকাতার উচ্চকোটির বুদ্ধিজীবীর সাথে অনুপ সাদির এতখানি হৃদ্যতা আছে তা জানতে পেরে যুগপৎ গর্বিত ও আশ্চর্যান্বিত হতে হয়েছে।

বাংলাদেশের মার্কসবাদ চর্চা থেকে নদী চর্চার ইতিহাস, লালন থেকে লেনিন, কিংবা বিলুপ্ত প্রাণী থেকে হো চি মিনের বাণী ইত্যাকার নানান বিষয়ে অজস্র নিবন্ধ রচনা করেছেন অনুপ সাদি। নিজস্ব ব্লগে, বইতে, বা সামাজিক মাধ্যমে সে সমস্তের উজ্জ্বল স্বাক্ষর আছে, কিন্তু আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন, এতো লেখালিখির মধ্যে সবচেয়ে পছন্দের বইটি কি, নির্দ্বিধায় উত্তর দেব, নিজকথায় লোককথায় হুমায়ুন আজাদ। আজাদের মত ব্যতিক্রমী, সাহসী সাহিত্যিক ও প্রাগ্রসর চিন্তাাবিদ বাংলাদেশ তো দূরস্থান গোটা উপমহাদেশে বিরল। সেই আজাদের সাথে সাক্ষাতকার নিয়ে চমৎকার জীবনপঞ্জী বানিয়েছেন লেখক। সেই অসামান্য কথাসাহিত্যিকের জীবনচর্যা তুলে ধরেছেন ছাপার অক্ষরে, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে সাহসী উপস্থাপনা। আর সেই গ্রন্থটি লেখকের আর পাঁচটা বই-এর চেয়ে ব্যতিক্রমী। অন্যন্য রূঢ় ও গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়, মানে নীরস তাত্ত্বিক কচকচানি বর্জিত, সরল মায়াময় লেখনী।

উইকিপিডিয়ায় কাজ করতে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে একাধিক অনুরোধ এসেছে বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনী বানিয়ে দেওয়ার। যেগুলি হয়ত বা আমার অপছন্দের কাজই ছিল। তবুও করতে হয়েছে, কারণ অনুপ সাদির অনুরোধ ফেলা যায় না। আমি নিশ্চিত উনি কাজগুলি নিজেই দিব্যি করতে পারতেন তবুও আমাকে দিয়ে বা অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিতে চান, নিজে কিঞ্চিত আড়ালে থেকে। হয়ত চাইছেন আরো কেউ পরিচিতি পাক, নতুন কেউ বাংলা উইকিপিডিয়াকে সমৃদ্ধ করুক। এ ধরণের বিনয়স্বভাব ব্যক্তি আমার মতো রুক্ষ এবং দুর্বিনীত লোকের বন্ধু হওয়াটা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, তবু বন্ধুত্ব অটুট আছে।

আরো একটা অপ্রিয় বিষয় যা না বললেই চলে না, সেটি হলো, সাদি ভাইয়ের বিষয়গতভাবে মার্কসবাদের প্রতি অত্যধিক ঝোঁক, এবং সেই সংক্রান্ত একমুখীনতা। দুনিয়ার সমস্ত কিছুকেই, মানে প্রেম, আবেগ, হাসি, কান্না ও যাবতীয় অনুভবকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আলোকে ব্যাখ্যা করার বিপজ্জনক প্রবণতা। আশেপাশের বহুজনের মধ্যেই এই প্রবণতা প্রায়শই দেখে থাকি। দেখে দেখে হেজে গেছি। যখন আমি তাকে বলি বাংলাদেশের পতিতাবৃত্তির ইতিহাস নিয়ে কিছু কাজ করুন, অন্ততপক্ষে একজন বাম রাজনীতি চিন্তক, কি ধরণের বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে গণিকাবৃত্তিকে দেখেন তা জানার আগ্রহ রয়েছে। উনি প্রস্তাবটি অবলীলাক্রমে উড়িয়ে দেন ও আমায় হতাশ করে জানান এই কাজগুলি বুর্জোয়া ও দেখনদারি গবেষকদের জন্য ছেড়ে রাখাই যুক্তিযুক্ত। চিন্তার এ জাতীয় সীমাবদ্ধতা ডান ও বাম উভয়পন্থী লেখকদের মধ্যেই দেখা যায়। তবে দ্বন্দ্বতত্ত্ব অনুযায়ী লিমিটেশন থাকবেই, থাকাটাই স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষের লক্ষণ। কখনো কেউ সর্বাঙ্গসুন্দর হয় না।

বহু দূর থেকে, ভিন্নদেশের মফঃস্বল শহরে বসে, দিব্যি দেখতে পাই, হাজারো সাংসারিক কাজের ফাঁকে, একজন অতি সাধারণ মানুষ নিবিষ্টমনে লিখে চলেছেন তার ব্লগ, কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, দর্শনে কেউ অনুপ্রাণিত হোক চাই না হোক, একাকী রচনা করে যাচ্ছেন রকমারী নিবন্ধ, সমৃদ্ধ করছেন বাংলা বিশ্বকোষ, সাহিত্যের আঙিনায় উপহার দিচ্ছেন একের পর এক ইতিহাসনিষ্ঠ আকর গ্রন্থ।

অনুপ সাদি একজন কবিও বটে। তবে শব্দ শিল্পী নন, সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলে কবি রুদ্রের ভাষায় তিনি হয়ত একজন শব্দ শ্রমিক, শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাচ্ছেন, আর বারুদে নিরন্তর সাজিয়ে চলেছেন কোমল বর্ণমালা। বহুদিন, বহুদিন চলতে থাকুক, আদর্শকে আঁকড়ে থাকা অনুপ সাদির তীক্ষ্ণ শাণিত কলম।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, দিল্লি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: অনুপ সাদি সম্পর্কিত এই মূল্যায়নটি এনামূল হক পলাশ সম্পাদিত সাহিত্যের ছোট কাগজ অন্তরাশ্রম-এর অনুপ সাদি সংখ্যা, সংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ২০-২২, ময়মনসিংহ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২২ তারিখে প্রকাশিত এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!