ভ্যান গখ-এর চিত্রকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে শ্রমিকের সংগ্রামের গল্প

চিত্রশিল্পী ভ্যান গখ একটি শক্তির নাম। যা মানুষের মাঝে হতাশা ঝেড়ে প্রেরণা যোগায়। মানুষকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখায়। এই কিংবদন্তী শিল্পী জীবনদশায় স্বীকৃতি পাননি। নিজের খ্যাতির কিছুই দেখে যেতে পারেননি। অসুস্থতা, হতাশা, অভাব ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যা করেন। তার আঁকা ছবিগুলোর জন্য যেমন তিনি বিখ্যাত তেমনি নিজের জীবনের সংগ্রামের জন্যও অনেকের কাছে আদর্শ। দুঃখ, বেদনা, বিষাদ, বিষণ্ণতা, হতাশা নিয়েও শিল্প জগতে অসামান্য অবদান।[১]

জন্ম ও পরিচয়

ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগের জন্ম জুন্দার্ত, নেদারল্যান্ডে ৩০ মার্চ ১৮৫৩ সালে  ও মৃত্যু হয় ফ্রান্সে ২৯ জুলাই ১৮৯০। ওলন্দাজ এই চিত্রশিল্পী প্রকৃতির রুক্ষ সৌন্দর্যের ফুটিয়ে তুলে অতান্ত আবেগময় ভাবে নিজের প্রতিভায় রং ব্যবহার করেন। তাঁর কাজ বিখ্যাত ছিল যা বিংশ শতাব্দীর শিল্পকলায় সুদূরপ্রসারি প্রভাব রেখেছিলো। ভ্যান গগ ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। এরপরও তাঁর আচরণে অভিজাতের অহংকার প্রকাশ পায় না।

মধ্যবিত্ত সম্পর্কে ধারণা

জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তিনি ঘর থেকে বের হন ২১ বছর বয়সে। তারপরে আর থাকার জন্য ঘরে ফেরা হয়নি। ঘরে ফিরেছিল কাজ করার জন্য। ২১ বছর বয়সে তিনি ব্রেবাঁতে চাচার ছবি বিক্রি করার প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনে কাজ করেছেন। কাজটা পছন্দের ছিলনা তার কিন্তু কখন অবহেলা করেন নি।

এই কাজের মাধ্যমে ভ্যান গগের বিভিন্ন মানুষ সম্পর্কে ধারণা হয়েছিল। শিল্প সম্পর্কে ধারণা হয়েছিল। শিল্প সম্পর্কে কারো অরুচিকর আচরণ তিনি পছন্দ করতেন না। তাই মধ্যবিত্তদের সাথে প্রায় কথা কাটাকাটি করতেন। এই ব্যবসার মাধ্যমে তাঁর প্রশ্ন জাগে মধ্যবিত্তরা কেনো ছবি কিনতে পারে আর দরিদ্ররা কেনইবা ছবি কিনতে পারেনা। মধ্যবিত্তদের সম্পর্কে ভ্যান গগের ধারণা হয় ‘মধ্যবিত্তরা হীনবুদ্ধিতা এবং বাণিজ্যিক জীবনের এক পরিপূর্ণ প্রতীক’। একসময় বুঝতে পারেন চাকরিটা তার পক্ষে করা সম্ভব না। গ্রহণ করেন বাবার পছন্দ অনুযায়ী ধর্মযাজকের কাজ।[২]

ভ্যান গখ-এর কাজের প্রক্রিয়া

২৮ বছর বয়সে ছবি আঁকা শুরু করেন ভ্যান গগ। ছবি আঁকার জন্য কোন গুরু বা পন্ডিতের কাছে যাননি। নিজে নিজেই চেষ্টা করেন রং নিয়ে খেলতে। রঙের ব্যবহার সম্পর্কে ধরনা কম থাকায় শুরুর ছবিগুলোতে গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি। সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতা ও কঠিন বিষয়গুলোকে সামনে আনাই ছিল ছবির মূল উদ্দেশ্য। দরিদ্রতা, গরীব, শ্রমিক, কৃষকের জীবনযাপন ভ্যান গগের প্রথম দিককার ছবিগুলোতে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। ধীরে ধীরে রঙ সম্পর্কে সচেতন হন ও এর সঠিক ব্যবহার করেন ছবিতে।[১]  

আরো পড়ুন:  লোকসংস্কৃতি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দ্বারা ভাগ করা সংস্কৃতির অভিব্যক্তিপূর্ণ অঙ্গ

ভ্যান গগের মাঝে প্রগতিশীলতার বিষয়টি লুকিয়ে ছিল তা প্রকাশ পায় কয়লা শ্রমিকদের সাথে কাজ করার মধ্যে দিয়ে। তিনি শ্রমিকদের সাথে থেকেছেন তাঁদের খাবার খেয়েছে; এমনকি কয়লা শ্রমিকরা যেভাবে থাকতে ঠিক সেই ভাবে থাকতেন। এছাড়াও তিনি কৃষকের সাথে জমিতে গিয়েছেন। একজন কৃষক যেমন শস্যদানা পাওয়ার জন্য রোদে-বৃষ্টিতে-শীতের সাথে লড়ায় করে ভ্যান গখও তেমনটি করেছে একটি সুন্দর ছবি পাওয়ার জন্য। এরসঙ্গে কৃষকের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তাদের দৈনদিন জীবনের সাথে মিশেছেন।

প্রকৃতির ছবি আঁকার জন্যও একই কাজ করতেন। প্রখর রোদে পুড়ে সূর্যমুখীর ছবি এঁকেছেন। মাথার চুল পুড়ে বাদামী হয়েছিলো কিন্তু টুপি না পরেই ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন একটি সুন্দর ছবির জন্য। এই ছবি আঁকার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। নানা জনের নানা কথা শুনেছিলেন কিন্তু অন্যের কথাকে উপেক্ষা করে মাঠে যেতেন।

শিল্পী জীবনের শুরু

ভ্যান গগ ছবি আঁকাতে যখন হাতেখড়ি নেন তখন তাঁর বয়স ২৮ বছর। ছবি আঁকার জন্য ভ্যান গগ এর প্রথম দৃষ্টি পড়ে শ্রমজীবীদের উপর। কয়লা শ্রমিকের জীবনচিত্র ভ্যান গগের ক্যানভাসে প্রথম স্থান পায়। ভ্যান গগের ছবির বিষয় ছিল কৃষক, শ্রমিক, প্রকৃতি। ছবির মধ্যে গাঢ় রং ব্যবহার করতেন। দিনের শুরুতে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, প্রখর আলোর তেজস্বী রূপ, শ্রমিক, কৃষকের কাজের উদ্দাম, আলো আঁধারের খেলা সব কিছু তিনি অকৃত্রিম ভাবে তুলে এনেছেন তাঁর ক্যানভাসে। প্রকৃতি বাস্তবে যে গাঢ়ত্ব ধারণ করে ভ্যান গগ সেই রূপ তাঁর ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন। ভ্যান গগ ছিলেন প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি অতি সংবেদনশীল। তিনি জানতেন যদি সাধারণ মানুষের মত জীবনযাপন করেন তাহলে ছবি আঁকতে পারবেন না। ভ্যান গগ বিশ্বাস করতেন, “হীরক বা রত্ন খোঁজার চাইতে একটি ভালো ছবি তৈরি করা এখন আর সহজ কর্ম নয়” । ছবি আঁকা একটি সৃজনশীল কাজ আর জগৎতে সব সৃজনশীল কাজই সবচেয়ে কঠিন কাজ। ভ্যান গগ এই কঠিন কাজটাকেই ভালবেসেছেন।  

আরো পড়ুন:  সাংস্কৃতিক বিপ্লব ব্যক্তিগত মালিকানা উচ্ছেদের জন্য সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন

ভ্যান গখ-এর শ্রমিকদের সাথে কাজ

ভ্যান গখ মনে করতেন অভিজাত এলাকার চেয়ে গরিব, শ্রমিকদের মাঝে ধর্মের প্রযোজন বেশি। তিনি দেখেছিলে কয়লা শ্রমিকরা কঠিন জীবন যাপন করত। অসুস্থ হলে চিকিৎসার টাকা থাকতো না। আগামীতে কি খাবে তার চিন্তা প্রতি মুহুর্তে করতে হত। জীবনের সাথে শ্রমিকের খারাপ দর কষাকষির সম্পর্ক। তাই তাদের সান্ত্বনা অনুভব করার জন্য ঈশ্বর চিন্তার প্রযোজন। এজন্য তিনি বোরিনেজে খনি অঞ্চলে কাজ শুরু করেন। কয়লা শ্রমিকদের কাছে ভ্যান গখ বন্ধু হয়ে উঠলেন।

শ্রমিকদের প্রতি মালিকদের শোষন দেখে ধর্মযাজকের কাজ ছেড়ে শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন। অনেক চেষ্টা করেও যখন দেখছেন শ্রমিকদের মালিকের জাতেকল থেকে রক্ষা করতে পারছেন না তখন আবার হতাশা নেমে আসে। তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জ্ঞান না থাকায় সহজেই ভেঙ্গে পড়তেন। তার মন সবসময় শিল্পী মন; তাই সমাজের জটিলতাকে কাছে থেকে দেখলেও সমাধানের উপায় জানতেন না।

ভ্যান গগে হতাশার মুহুর্তগুলোতে সবসময় মানসিক শক্তি দিত ছোট ভাই থিও। শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে যখন হতাশায় বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন ঠিক সেই সময় ছোট ভাই থিও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। থিও এর সাথে পরামর্শ করে ভ্যান গগ ছবি আঁকার জগৎ-এ পা বাড়ান। থিও বলেন ছবি আঁকা হলে ছবিগুলো তাঁর কাছে পাঠাতে এবং এর জন্য মাসে তাকে কিছু টাকা দিবে যা ছবির উপকরণ কেনা ও জীবন পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হবে। এর পরেই শুরু হল জীবনের নতুন অধ্যায়।[২]

বিখ্যাত ছবি

প্রতিটি ছবি বিখ্যাত হবার পেছনে রয়েছে সুখ, দুঃখ, বেদনা, ব্যর্থতা, প্রেমহীনতা, একাকীত্ব, হতাশা জড়ানো গল্প। কীভাবে ছবি সুন্দর করতে হবে সেটা নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা হতো। সেইসময়ের খ্যাতিমান শিল্পীদের বাড়ি গিয়ে আলোচনা করতেন।

দ্য স্টারি নাইট, ১৮৮৯: শরীরে নানাধরনের রোগের বাস শুরু হয়। এমন সময়১৮৮৮ সালে এক নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে যায়। তিনি নিজের কান নিজেই কেটে ফেলেছিলেন। সেই কান পতিতালয়ের এক মেয়েকে উপহার দিতে যান। এরপরে বুঝতে পারেন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। স্বেচ্ছায় ফ্রান্সের সেইন্ট রেমি-ডি প্রদেশের একটি আশ্রমে ভর্তি হন। সেখানে থাকা অবস্থায় ১৮৮৯ সালে তার ঘরের জানালা থেকে দেখেছিলেন সূর্যদয়ের দৃশ্য এবং এই ছবিটি এঁকেছিলেন। তেলরঙের এই ছবিটি একেছিলেন ২১ বার। রাত, ভোর, সূর্যদয়, দিনের প্রখরতা, সূর্যাস্ত নানাভাবে এঁকেছিলেন। ছবিতে যে গ্রামের দৃশ্য আছে সেটা কাল্পনিক।

আরো পড়ুন:  সদর দফতরে কামান দাগো

দ্য পটেটো ইটার্স, ১৮৮৫:  এটি ছিলো বাস্তবতাকে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো চিত্র। তিনি অনেক চেষ্টা করেছিলেন কৃষিজীবন ফুটে তোলার জন্য। তিনি নিজেও শীতের সকালে চলে যেতেন চাষিদের ক্ষেতে। সারাদিন তাদের কাজ দেখতেন, কথা বলতেন। তাদের আচরণ বুঝার চেষ্টা করতেন। এই ছবিটি শীতের রাতের। এক জীর্ণ কুড়েঘরে পাঁচসদস্যের কৃষক পরিবার। এখানে চারজন নারী আর একজন পুরুষ। অন্ধকারে আঁকা হলেও স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। একটু সচেতনভাবে খেয়াল করলে তাদের কষ্টকে বুঝা যাবে। এইধরনের ছবি দেখলে মনে হয় পরিশ্রমী মানুষের প্রতি গখের ভালোবাসা, মমত্ববোধকে। তিনি চেয়েছিলেন নিজের আঁকা ছবির মাধ্যমে যেনো খেটে-খাওয়া শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফুটে উঠে এবং অন্যরা তার মূল্য দিতে শেখে।

ভাস উইথ ফিফটিন সানফ্লাওয়ারস, ১৮৮৮: সানফ্লাওয়ার তার সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি। নানাভাবে তিনি এটাকে এঁকেছেন। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে নিজেকে তামাটে করেছেন। প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে রঙের গাঢ়ত্ব ও গভীরতা প্রকাশ করেছেন।

তথ্যসূত্র:

১. দোলন প্রভা, ২৯ আগস্ট, ২০১৮, “ভিনসেন্ট ভ্যান গখ প্রেরণার আরেক নাম”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/art/vincent-van-gogh/

২.আর্ভি স্টোন  অনুবাদক সিদ্দিকুর রহমান লাস্ট ফর লাইফ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জুন ২০০৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!