নিকোলাস কোপার্নিকাস ছিলেন আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক

নিকোলাস কোপার্নিকাস বা নিকোলাস কোপের্নিকাস (ইংরেজি: Nicolaus Copernicus; ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৪৭৩ – ২৪ মে ১৫৪৩) একজন রেনেসাঁস মহাজ্ঞানী যিনি একজন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং ক্যাথলিক ধর্মানুশাসক হিসাবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিশ্বজগতের এমন একটি গাণিতিক প্রতিমাণ বা মডেল তৈরি করেছিলেন যা পৃথিবীর চেয়ে সূর্যকে তার কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছিল। সমস্ত সম্ভাবনার মধ্যেই, কোপারনিকাস তাঁর মডেলটি স্বাধীনভাবে বিকাশ করেছিলেন প্রাচীন গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী সামোসের অ্যারিস্টার্কাসের মতো করে, যিনি প্রায় আঠার শতাব্দী আগে এই জাতীয় একটি প্রতিমাণ বা মডেল তৈরি করেছিলেন।[১]

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক নিকোলাস কোপার্নিকাসের  জন্ম হয়েছিল পোলাণ্ডে। সৌরজগতের বর্তমান সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কপারনিকাসের পূর্ব পর্যন্ত সূর্য, চন্দ্র এবং পৃথিবীর আবর্তনের ব্যাখ্যায় টলেমীর পৃথিবী কেন্দ্রিক তত্ত্বই ছিল স্বীকৃত তত্ত্ব। টলেমীর তত্ত্বানুযায়ী পৃথিবী হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র। পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সূর্য-চন্দ্র প্রভৃতির আবর্তন।

মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সংগে দার্শনিক এরিস্টটলের ব্যাখ্যা কিংবা টলেমীর তত্ত্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। সকলেই পৃথিবীকেই বিশ্বজগতের কেন্দ্র বলে মনে করেছে। এই প্রতিষ্ঠিত মতের ক্ষেত্রে কপারনিকাসের তত্ত্ব সাধারণ বিশ্বাসের একেবারে বিপরীত ছিল।

প্রাচীন গ্রিসের বস্তুবাদী দার্শনিকদের পৃথিবীর আবর্তনের তত্ত্বের উপর নির্ভর করে পূর্ণতর গবেষণায় কপারনিকাস টলেমীর তত্ত্বকে ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সূর্যই হচ্ছে কেন্দ্র। পৃথিবী হচ্ছে সূর্যের গ্রহ। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ৩৬৫ দিনে যেমন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে তেমনি নিজের মেরুদণ্ডের উপরও সে আবর্তিত হচ্ছে।[২]

পোল্যান্ডের ফ্রয়েনবার্গ চার্চ। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের ওপর কিছু দূর অন্তর অন্তর প্রহরীদের জন্যে ‘ওয়াচ টাওয়ার’ বা নজরদারি গম্বুজ। এরকম একটি গম্বুজ থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ করেন চল্লিশ ছুঁই-ছুই এক যুবক। খালি চোখেই। ওই গির্জার। তিনি ক্যানন অর্থাৎ মুখ্য যাজক। সারাদিন, কখনও রাত পর্যন্ত নানা প্রশাসনিক ও ধর্মীয় দায়দায়িত্ব, রোগী দেখা, তিনি আবার চিকিৎসকও, এ সব ঠাসবুনোট কাজের ফাঁকে সামান্য ফুরসত পেলেই তিনি চলে আসেন ‘ওয়াচ টাওয়ার’-এ। কখনও কখনও সঙ্গে থাকে কাঠের তৈরি দু-একটা পর্যবেক্ষণ যন্ত্র আর নোটবুক। মাঝে মাঝে নোটবুকে কী সব লেখেন, আঁকিবুকি কাটেন। যুবকটির প্রথম এবং প্রধান ভালবাসা জ্যোতির্বিজ্ঞান।

এ ছবি আজকের নয়, প্রায় পাঁচশো বছর আগেকার। তখন ষোড়শ শতাব্দীর সূচনাকাল। ইউরোপে শুরু হয়েছে রেনেসাঁ— নবজাগরণ। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, ভাবনাচিন্তায় ক্রমশ দেখা দিচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ধারা। পুরনো ধ্যানধারণার নিগড় ভেঙে বেরিয়ে আসার প্রায় নিঃশব্দ প্রয়াস। ঈষৎ কল্পনামিশ্রিত ওই দৃশ্যে যে যুবকটিকে দেখা গেল, তিনিও এর শরিক। যুবকের নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস যিনি পৃথিবীকে ব্রহ্মাণ্ডে কেন্দ্রচ্যুত করেছিলেন, সূর্যকে বসিয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব আসনে। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে চলে আসা ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করে প্রথম যুক্তিসম্মত গণনার দ্বারা প্রমাণ করেছিলেন সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে আছে সূর্য, পৃথিবী নয়। পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে অবিরাম। নিজের অক্ষের ওপরেও ঘুরছে পৃথিবী। কাজেই আমাদের এই বাসভূমি স্থির এবং অনড় নয়। আজ আমাদের যতই মনে হোক—এ তো জানা কথা, সে সময় এটা মেনে নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থেও পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বের তত্ত্বই স্বীকৃত ছিল। তার বিরুদ্ধে কিছু বলা মানে ধর্মদ্রোহিতা। সে সব জেনে এবং খ্রিস্টান যাজক হয়েও কোপারনিকাস কিন্তু তাঁর গবেষণায় বিরত হননি। তিনি ছিলেন প্রকৃত সত্যসন্ধানী।

আরো পড়ুন:  টাইকো ব্রাহে জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণের ধারণা বদলকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা

জন্ম ও শিক্ষাজীবনে কোপার্নিকাস

নিকোলাস কোপার্নিকাসের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, পোল্যান্ডের থর্ন শহরে। তার বাবা ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, জাতিতে পোলিশ। মা ছিলেন অভিজাত জার্মান পরিবারের মেয়ে। নিকোলাসের বাবা ক্রাকাও শহরে ব্যবসা করতেন। সেখান থেকে তিনি চলে আসেন ভিস্টুলা নদীর তীরে থর্নে। নিকোলাসের যখন মাত্র ১০ বছর বয়েস, তার বাবা মারা যান। মামা লুকাস ওয়াজেলরোড ভাগনের দেখাশোনার ভার নেন। লুকাসও ছিলেন যাজক। পরে এর্মল্যান্ডের বিশপ অর্থাৎ শীর্ষ যাজকও হন। যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল তার। নিকোলাসের লেখাপড়ার ভাল ব্যবস্থা করেছিলেন একেবারে গোড়া থেকেই। তাকে পাঠিয়েছিলেন প্যোল্যান্ডের ক্রাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করতে।

ক্রাকাওয়ে ছাত্রাবস্থায় নিকোলাস কোপার্নিকাস প্রথম গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে আকৃষ্ট হন। এ ক্ষেত্রে তাকে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন অ্যালবার্ট ব্রুডজিউস্কি নামে এক অধ্যাপক। তারই তত্ত্বাবধানে নিকোলাস অ্যাস্ট্রোলোব, সেক্সট্যান্ট প্রভৃতি তখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত যন্ত্রের ব্যবহার এবং পর্যবেক্ষণ-কৌশল আয়ত্ত করেন। দুরবিনের আবিষ্কার তখনও দূর অস্ত। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান অবশ্য নিকোলাসের মূল পাঠ্য বিষয় ছিল না। তিনি পড়তে গিয়েছিলেন আইন ও চিকিৎসাবিদ্যা।

সে সময় গির্জার যাজক হওয়া অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার ছিল। অর্থ, ক্ষমতা, সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল যাজকদের। তাই মামা ওয়াজেলরোড চেয়েছিলেন নিকোলাস শীর্ষস্থানীয় যাজক হিসেবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোন। যাজক হতে গেলে ধর্মীয় আইন এবং চিকিৎসাবিদ্যা দুটি বিষয়েই পারদর্শিতা চাই। কারণ গির্জার প্রশাসন পরিচালনার পাশাপাশি, স্থানীয় মানুষ জনের চিকিৎসার দায়িত্বও নিতে হত যাজকদের। আর নিকোলাস কোপারনিকাস কেবল ফ্রয়েনবার্গ চার্চের দক্ষ প্রশাসকই ছিলেন না, চিকিৎসক হিসেবেও তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল।

ক্রাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চতর শিক্ষার জন্যে নিকোলাস কোপার্নিকাস পাড়ি দেন ইতালিতে। বোলোনো, পাদুয়া এবং ফেরারা— ইতালির এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়েরই তখন সারা ইউরোপে খুব নামডাক। নিকোলাস বোলোনোয় ছিলেন পাঁচ বছর (১৪৯৬-১৫০১)। পড়েছিলেন গ্রিক দর্শন ও গণিত, প্লেটোর রচনা। পরবর্তী পাঁচ বছর পাদুয়ায় চিকিৎসাবিদ্যা এবং ফেরারায় ধর্মীয় আইনে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। ফেরারা থেকে ‘ক্যানন ল’ অর্থাৎ ধর্মীয় আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়ে ফিরে আসেন পোল্যান্ডে। বস্তুত, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সময় সে কালের গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, এমনকী চিকিৎসা শাস্ত্রেও যাবতীয় জ্ঞান আহরণ করেছিলেন কোপারনিকাস। 

আরো পড়ুন:  মার্কো পোলো একজন ভেনিসীয় বণিক, অনুসন্ধানকারী এবং লেখক

কর্মজীবনে কোপার্নিকাস

কোপার্নিকাস পোল্যান্ডে ফিরে কয়েক বছর মামার কাছেই ছিলেন। ১৫১২ সালে ওয়াজেলরোডের মৃত্যুর পর তিনি ফ্রয়েনবার্গ চার্চে ক্যাননের পদে যোগ দেন। এবং পরবর্তী ৩০ বছর, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। তার সেই জীবন তেমন ঘটনাবহুল ছিল না। কখনও কখনও অবশ্য দেশের রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন। অর্থনীতিতেও বেশ আগ্রহ ছিল তার। পোলিশ সরকারের অনুরোধে দেশের মুদ্রা সংস্কার নিয়ে একটি মূল্যবান রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন কোপারনিকাস। সাহিত্য এবং চিত্রাঙ্কনেও উৎসাহী ছিলেন। মাঝেমাঝে কবিতা লিখতেন, ছবিও আঁকতেন। তাঁর আঁকা নিজের ছবিও আছে। নিকোলাস কোপারনিকাস ছিলেন বিদ্বান, সংস্কৃতিমান, হৃদয়বান এক পরিপূর্ণ মানুষ। ফ্রয়েনবার্গ জেলার দরিদ্রদের তিনি চিকিৎসা করতেন বিনা পয়সায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন? কী ধরনের গবেষণা করেছিলেন তিনি? কোপারনিকাসের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার মূল ভিত্তি ছিল সেকালের জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত যাবতীয় তত্ত্ব অধ্যয়ন ও তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণও করেছিলেন, তবে তার ওপরে তেমন জোর দেননি। কোপারনিকাস সারা জীবনে ৬০টির মতো পর্যবেক্ষণ চালিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। আদিম কয়েকটি যন্ত্রপাতি এবং খালি চোখই ছিল তার সম্বল। তার চোখও বিশেষ ভাল ছিল না। কোপারনিকাসের আসল অস্ত্র ছিল গভীর পড়াশোনা, গণিতের জ্ঞান এবং তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা।

বোলোনোতে পড়ার সময়েই অ্যারিস্টটলীয় অনড় বিশ্বতত্ত্ব এবং দ্বিতীয় শতকের গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ক্লডিয়াস টোলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের ধারণা সম্পর্কে তার মনে সংশয় দেখা দেয়। টোলেমির লেখা মহাগ্রন্থ ‘আলমাজেস্ট’-এর নানা ত্রুটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডোমেনিকো দ্য নোভারার সঙ্গে তিনি আলোচনা করতেন। পৃথিবী যে গতিশীল, সৌরমণ্ডল তথা ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে তার অবস্থান নয়, এই ধারণার বীজ তিনি পেয়েছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর নিকোলাস অব পুসা, জর্জ পুরবাক, অ্যারিস্টারকাস প্রমুখ জ্যোতির্বিজ্ঞানীর লেখায়। অ্যারিস্টারকাস তো স্পষ্টই লিখে গিয়েছেন, পৃথিবী সূর্যের চার দিকে ঘোরে। পঞ্চম শতকের ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ আর্যভটও পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপরে ঘোরে অর্থাৎ এর আহ্নিক গতি আছে বলে বিশ্বাস করতেন।

কোপার্নিকাস রচিত ডি রেভোলিউশনিবাস সিলেস্যিয়াম

কিন্তু ওই প্রাচীন বিজ্ঞানীদের কেউই উপযুক্ত তথ্য ও গণনার সাহায্যে তাঁদের ধারণা বা তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। সেই কাজটাই প্রথম করে সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছিলেন নিকোলাস কোপারনিকাস। তাই তাঁকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। কোপারনিকাস অবশ্য গোড়ায় তাঁর গবেষণা ও তত্ত্ব প্রকাশে তেমন উৎসাহ দেখাননি। হয়তো ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ চটে যাবেন এই আশঙ্কাতেই। তবে ১৫৩০ সালে ‘কমেন্টারিওলাস’ নামে একটি প্রবন্ধে প্রথম তার সিদ্ধান্তের কথা লেখেন এবং সেটির পাণ্ডুলিপি ঘনিষ্ঠ মহলে প্রচার করেন। পাশাপাশি চলে এক মহাগ্রন্থ রচনার কাজ। ল্যাটিন ভাষায় লেখা সেই বইয়ের শিরোনাম ‘ডি রেভোলিউশনিবাস সিলেস্যিয়াম’, যার অর্থ জ্যোতিষ্কদের ঘূর্ণন। জার্মানির নুরেমবার্গ থেকে বইটি প্রকাশিত হয় ১৫৪৩ সালে। সেও রেটিকাস নামে তার এক ছাত্রের চেষ্টায়। গণিতের অধ্যাপক ওই জার্মান তরুণটি কোপারনিকাসের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ কাটানোর ইচ্ছায় এসে শেষ পর্যন্ত তার কাছে থেকে যান টানা দু বছর।

আরো পড়ুন:  আচার্য সুশ্রুত ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় শল্য চিকিৎসার অগ্রদূত

‘ডি রেরোলিউশনিবাস’ গ্রন্থে কোপার্নিকাস বলেছেন, পৃথিবীসহ সমস্ত গ্রহ সূর্যকে পরিক্রমা করছে আর পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর ঘুরছে লাটুর মতো। সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর পরিক্রমণ পথও নির্ণয় করেছিলেন তিনি। এবং তার ভিত্তিতে এক বছরের যে সময়কাল বের করেছিলেন, আধুনিক হিসেবের সঙ্গে তার তফাত মাত্র ২৮ সেকেন্ড। তখনও পর্যন্ত জানা বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি—এই ছটি গ্রহের সূর্যের সাপেক্ষে অবস্থান নির্ণয় করেছিলেন মোটামুটিভাবে। বলেছিলেন, সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর বার্ষিক গতির ফলেই হয় ঋতু পরিবর্তন। আর আকাশে সূর্যের যে গতি আমরা দেখি, যার ফলে দিন-রাত্রির পালাবদল ঘটে, তার পিছনে আছে পৃথিবীর আহ্নিক গতি। পৃথিবীর ঘূর্ণনের আপেক্ষিকেই সূর্যকে গতিশীল মনে হয়। গতির আপেক্ষিকতার স্পষ্ট ধারণা তার ছিল। কোপারনিকাস বলেছেন, কোনও বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তনের পিছনে আছে ওই বস্তু অথবা বস্তুটি যে দেখছে তার গতি।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ডি রেভোলিউশনিবাস’ এক যুগান্তকারী দলিল। একটি বিপ্লব। শোনা যায়, বইটি ছাপা হয়ে যখন কোপারনিকাসের হাতে এসে পৌছয়, তখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। এ বই না লেখা হলে আজকের মহাকাশ অভিযানও হয়তো পিছিয়ে যেত একশো বছর।[৩]

কোপার্নিকাসের পরবর্তী বৈজ্ঞানিকগণ বিশেষ করে কেপলার, (১৫৭১-১৬৩০) গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২) এবং নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) গ্রহ-উপগ্রহগুলির পরিক্রমণ পথ আরো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত করেন। কিন্তু পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণার উপর প্রথম আঘাত হানার কৃতিত্ব কপারনিকাসের। মানুষ যেখানে এর পূর্বে পৃথিবীকে সর্ববৃহৎ বলে কল্পনা করেছে আর এই পৃথিবীর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছে, সেখানে কপারনিকাস মানুষের জ্ঞানের সীমাকে পৃথিবীর বাইরে বৃহত্তর বিশ্বে অবারিত করেছেন। ধর্মের অন্ধ এবং অনড় বিশ্বাসের শেকল থেকে বিজ্ঞানের মুক্তিদাতার ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। এ কারণে যাজক-সম্প্রদায় থেকে শুরু করে প্রচলিত ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী সকল মহলই কপারনিকাসের উপর সেদিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল।

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ৬ মে ২০১৮, “নিকোলাস কোপার্নিকাস ছিলেন আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক এক মহান বিজ্ঞানী”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/nicolaus-copernicus/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১১৭
৩. বিমল বসু, বিজ্ঞানে অগ্রপথিক, অঙ্কুর প্রকাশনী, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ মে ২০১৬, পৃষ্ঠা ৪২-৪৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!