জিওর্দানো ব্রুনো ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ যুগের গণিতবিদ ও মহাজাগতিক তাত্ত্বিক

জিওর্দানো ব্রুনো বা জর্দানো ব্রুনো বা গিওর্দানো ব্রুনো (ইংরেজি: Giordano Bruno; ১৫৪৮-১৭ ফেব্রুয়ারি ১৬০০) ছিলেন একজন ইতালিয়ান ডোমিনিকান খ্রীষ্টান ভিক্ষু, দার্শনিক, গণিতবিদ, কবি, মহাজাগতিক তাত্ত্বিক এবং হারমেটিক জাদুবিদ। তিনি তাঁর মহাজাগতিক তত্ত্বগুলির জন্য পরিচিত, যা তত্কালীন-অভিনব কোপার্নিকান মডেলকে ধারণাগতভাবে প্রসারিত করেছিল। তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে তারাগুলি তাদের নিজস্ব গ্রহ দ্বারা বেষ্টিত দূরবর্তী সূর্য, এবং তিনি এই সম্ভাবনা উত্থাপন করেছিলেন যে এই গ্রহগুলি তাদের নিজের জীবনকে পালন করতে পারে, যা একটি মহাজাগতিক অবস্থান যা মহাজাগতিক বহুত্ববাদ হিসাবে পরিচিত। তিনি আরও জোর দিয়েছিলেন যে মহাবিশ্ব অসীম এবং এর কোনও “কেন্দ্র” থাকতে পারে না।[১]

জিওর্দানো ব্রুনো ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান, পড়াশুনা করেছিলেন নেপলস বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঘুরেছিলেন ইউরোপের বহু দেশ, ছিলেন একই সংগে সুবক্তা ও সুলেখক, নির্ভীক ও বিদ্রোহী। তাঁকে নিয়ে একাধিক সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। জিওর্দানো ব্রুনো ছিলেন ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। তিনি কেবল দার্শনিক ছিলেন না, তিনি ইতালির বিখ্যাত কবি এবং নাট্যকার বলেও পরিচিত।[২]

আবিষ্কারক জিওর্দানো ব্রুনো

স্বাধীন প্রবক্তা ব্রুনো খ্রিষ্ট ধর্মের ডমিনিকান মত পরিত্যাগ করায় গোঁড়া সাধক সম্প্রদায় তাঁকে ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় আদালতে বিচার করে প্রথমে কারাগারে নিক্ষেপ করে। দীর্ঘ আট বছর কারাগারে নির্মম নির্যাতনের পরে ব্রুনোকে রোম শহরে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। তাঁকে পুড়িয়ে মারার যথেষ্ট প্রয়োজন ধর্ম যাজকদের ছিল না, কেননা ধর্মের মূলগত বিরোধীতা তার উদ্দেশ্য নয়, তিনি বিজ্ঞানকে ধর্মের সংগে সমন্বিত করতে চেয়েছিলেন।  

জিওর্দানো ব্রুনো মধ্যযুগের ধর্মতত্ত্বের বিরোধী ছিলেন। তিনি রোমান ক্যাথলিক মতকে সমালোচনা করেন।  জীবন এবং জগৎ সম্পর্কে তাঁর অভিমত ছিল বিস্ময়কররূপে বস্তুবাদী। এই বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টি তিনি প্রাচীন গ্রিসের বস্তুবাদী দার্শনিকদের নিকট থেকেই প্রধানত লাভ করেন। তাঁর বস্তুবাদ প্যানথিজম বা সর্বপ্রাণবাদ বলে আখ্যায়িত হয়। ব্রুনো বিশ্বাস করতেন, একটা বিশ্বপ্রাণের অস্তিত্ব আছে। এই প্রাণ সর্ববস্তুতেই প্রকাশমান। ব্রুনোর মতে প্রকৃতি বা জগৎ হচ্ছে অসীম। তিনি পৃথিবী সম্পর্কে কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে স্বীকার করেন। কিন্তু ব্রুনোর অভিমতে আমরা কেবলমাত্র কপারনিকাসের তত্ত্বের স্বীকৃতি পাইনে, তাঁর অভিমতে কপারনিকাসের তত্ত্বের অধিকতর বৈজ্ঞানিক বিকাশও লক্ষ করা যায়। কারণ কপারনিকাস যেখানে সূর্যকে স্থির এবং সৌরমণ্ডলকে একমাত্র মণ্ডল বলে মনে করতেন, সেখানে জিওর্দানো ব্রুনো এরূপ অভিমত প্রকাশ করেন যে, সূর্য স্থির নয় এবং সৌরমণ্ডল একমাত্র সৃষ্টিমণ্ডল নয়।

আরো পড়ুন:  ইভান পাভলভ ছিলেন রুশদেশের একজন বিখ্যাত প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও শরীরতত্ত্ববিদ

জর্দানো ব্রুনো এমন মত প্রকাশ করেন যে, মহাজগতে অসংখ্য জগতের অস্তিত্ব রয়েছে এবং সৌরমণ্ডল একমাত্র সৃষ্টিমণ্ডল নয়। তাঁর মতে মহাজগতে অসংখ্য জগতের অস্তিত্ব রয়েছে এবং পৃথিবী ছাড়া অপর জগতেও জীবন থাকা সম্ভব। ব্রুনোর পূর্বে পৃথিবী গ্রহের গঠন সম্পর্কে কোনো সুসমঞ্জস ধারণা ছিল না। ব্রুনোই বলেন যে, পৃথিবরি সর্বাঞ্চলের গঠনের মধ্যেই মাটি, পানি, বাতাস, তেজ এবং ইথারের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য আছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকের ন্যায় ব্রুনোও বস্তুকে গতিময় মনে করতেন। মানুষের চেতনাও বস্তু বা প্রকৃতিরই ভেদ। এ সমস্ত অভিমত ছাড়া সমগ্র প্রকৃতির গতি, মহাজগতের ঐক্য এবং অস্তিত্বের পারস্পরিক নির্ভরতা প্রভৃতি প্রশ্নেও ব্রুনোর চিন্তা ছিল বৈজ্ঞানিক।[৩]

জিওর্দানো ব্রুনোর অধ্যবসায় ও স্বার্থত্যাগের মধ্য দিয়ে সন্দেহাতীতভাবে বিজ্ঞানের জয়ই ঘোষিত হয়েছিল, বোঝা গেছিল, বিজ্ঞানের সূত্রগুলি বাইরে থেকে কেউ চাপিয়ে দিতে পারে না। এই বাস্তবমুখী অনুসন্ধিৎসাই ছিল পুঁজিবাদী বিজ্ঞানের মূল সুর। ব্রুনো ও গ্যালিলিওর পর থেকে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ মতবাদের অন্ধ অনুসরণের নিয়মে শৈথিল্য ঘটান, যেটা করা হয় কৌশলগত কারণে, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও সময়ের সংগে ধর্মকে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য।

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ৭ মে ২০১৯, “জর্দানো ব্রুনো ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/giordano-bruno/
২. ধীমান দাশগুপ্ত, বিজ্ঞানী চরিতাভিধান, দ্বিতীয় খণ্ড, বাণীশিল্প, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১০০-১০১
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৯৪।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page