আর্কিমিডিস গ্রীক গণিতবিদ, পদার্থবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, উদ্ভাবক এবং জ্যোতির্বিদ

আর্কিমিডিস বা সাইরাকিউজের আর্কিমিডিস (ইংরেজি: Archimedes; খ্রি.পূ. ২৮৭-২১২) ছিলেন একজন গ্রীক গণিতবিদ, পদার্থবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, উদ্ভাবক এবং জ্যোতির্বিদ। তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা গণিতজ্ঞ বলা হয়। যদিও তাঁর জীবনের অল্প কয়েকটি বিবরণ জানা যায়, তিনি ধ্রুপদী প্রাচীনকালের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী হিসাবে বিবেচিত হন। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ আর্কিমিডিসকে আইজ্যাক নিউটন এবং কার্ল গস-এর সমতুল্য গণিতবিদ বলে মনে করেন।

কাল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক। স্থান তৎকালীন সিসিলির বা বর্তমান ইতালির সাইরাকিউজ শহর। রোমান সেনানাবাহিনীর আক্রমণে তটস্থ। সাইরাকিউজের রাজা হেরন ডাকলেন তার আত্মীয় এবং সে কালের বিখ্যাততম বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসকে। বিজ্ঞানী সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্ভাবিত সমর-সরঞ্জাম নিয়ে নেমে পড়লেন। সরঞ্জাম বলতে প্রস্তর-খণ্ড নিক্ষেপক বড় গুলতি, পুলি এবং ধাতুর তৈরি বড় বড় আয়না।

কী করলেন আর্কিমিডিস? গুলতি দিয়ে শত্রুপক্ষের জাহাজ লক্ষ করে পাথরের মিজাইল ছুড়তে লাগলেন। প্রকাণ্ড লম্বা দণ্ডের সঙ্গে পুলি বা কপিকল লাগিয়ে মস্ত মস্ত পাথর ফেললেন একেবারে জাহাজের উপর। এতেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি। ধাতুর তৈরি আয়নার সাহায্যে সূর্যের প্রতিফলিত রশ্মি সরাসরি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলেন একের পর এক রণতরী। এইভাবে প্রায় তিন বছর ঠেকিয়ে রাখা গিয়েছিল রোমান বাহিনীকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এক সময় শহরে ঢুকে সব তছনছ করে ফেলে শত্রু সেনারা। যার বলি হতে হয় আর্কিমিডিসকেও।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

সাইরাকিউজেই ২৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আর্কিমিডিসের জন্ম হয়। তার পিতা ফিডিয়াস ছিলেন জ্যোতির্বিদ। আর্কিমিডিসের ছেলেবেলা এবং প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। যৌবনে শিক্ষা গ্রহণের জন্যে তিনি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় যান। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের অধীনে যাওয়ায় পর থেকেই আলেকজান্দ্রিয়া ধীরে ধীরে তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মেধা তথা শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আলেকজান্দ্রিয়ায় পড়াশোনা শেষ করে আর্কিমিডিস ফিরে আসেন সাইরাকিউজে এবং আমৃত্যু সেখানেই কাটান। তাঁর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিত চর্চারও পীঠস্থান ওই শহর।

আর্কিমিডিসের আবিষ্কার ও উদ্ভাবন নিয়ে নানা গল্প আছে। এর মধ্যে তরল পদার্থের ‘বয়ান্সি’ বা প্লবতা আবিষ্কারের গল্পটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। স্কুল ছাত্রেরও জানা। কোনও বস্তুকে জল বা তান্য কোনও তরলে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ডোবালে বস্তুটি তার ডুবে থাকা অংশের সম আয়তনের তরলকে সরিয়ে দেয়। যতটুকু তরল অপসারিত হয়, তার ওজন বস্তুটির থেকে বেশি হলে, সেটি তরলে ভাসে, কম হলে বস্তুটি ডুবে যায়। যা ‘আর্কিমিডিস প্রিন্সিপল’ বা আর্কিমিডিসের নীতি বা তত্ত্ব বলে পরিচিত এবং পদার্থবিদ্যার এক চিরকালীন সত্যও।

আরো পড়ুন:  জোহানেস কেপলার ছিলেন একজন জার্মান জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ এবং জ্যোতিষী

এই তত্ত্ব আবিষ্কার ঘিরে গল্পটিও চমকপ্রদ। সাইরাকিউজের রাজা হেরন তার আরাধ্য দেবতার জন্যে একটি সোনার মুকুট গড়তে দেন স্বর্ণকারকে। মুকুটটি হাতে পাওয়ার পর তাতে খাদ আছে বলে তার মনে সন্দেহ জাগে। মুকুট ভেঙে সেটা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যেতেই পারত। কিন্তু অপূর্ব সুন্দর মুকুটটি ভাঙতে তার মন চাইল না। না ভেঙে খাদ আছে কি না, সেটা বের করা সম্ভব? তার কি কোনও উপায় আছে?

উপায় খুঁজতে অতএব ডাক পড়ল আর্কিমিডিসের। এর পর নাওয়া খাওয়া ভুলে ভাবতে লাগলেন বিজ্ঞানী। ভাবতে ভাবতেই একদিন অন্যমনস্কভাবে চৌবাচ্চায় স্নান করতে গেলেন। চৌবাচ্চায় নামতেই কিছুটা জল উপছে বাইরে পড়ে গেল। অমনি বিদ্যুচ্চমকের মতো তার মাথায় গেল সত্যটা। শোনা যায়, এই হঠাৎ আবিষ্কারের আনন্দে আর্কিমিডিস নাকি নগ্ন অবস্থায় ‘ইউরেকা ইউরেকা’ অর্থাৎ ‘পেয়েছি পেয়েছি’ বলে চিৎকার করতে করতে ছুটে একেবারে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন।

এর পরই সত্যটি প্রমাণের জন্যে আসল পরীক্ষায় নামেন তিনি। একটি পাত্র কানায় কানায় জলে ভর্তি করে তার মধ্যে মুকুটটি ডুবিয়ে যতটা জল অপসারিত হয়, সেটা মেপে নেন। এ বার মুকুটটির সমান ভর ও আয়তনের খাঁটি সোনা ডুবিয়ে দেখে নেন কী পরিমাণ জল অপসারিত হলো। দেখা গেল উভয় ক্ষেত্রে অপসৃত জলের পরিমাণ এক নয়। অর্থাৎ মুকুটে অবশ্যই অন্য কোনও ধাতুর খাদ আছে। এই পরীক্ষার ভিত্তিতেই তিনি ভাসমান বস্তুর নিয়ম বা প্লবতার নীতি রচনা করেন। 

‘লজ অফ লিভার’ বা লিভারের নিয়ম আবিষ্কারও আর্কিমিডিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আজ পর্যন্ত লিভার-ভিত্তিক নানা পরীক্ষা ও বহুবিধ যন্ত্র নির্মাণ যে নিয়ম মেনেই সম্ভব হচ্ছে। একটি ‘ফালক্রাম’ বা আলম্বের উপরে একটি দণ্ড বসিয়ে দিলেই তা সিম্পল বা সরল লিভার হয়ে যায়। দণ্ডটির অবশ্য আলম্বের উপর মুক্তভাবে উপরে-নিচে নড়াচড়ার ব্যবস্থায় থাকা চাই। আলম্বের বাঁ দিকে দণ্ডের অংশের দৈর্ঘ্য ডান দিকের তুলনায় কম হলে, বাম প্রান্তে অল্প শক্তি প্রয়োগ করে ডান প্রান্তে ঝোলানো কোনও ভারী বস্তুকে সহজেই তোলা যায়। লিভার যন্ত্রের এটাই মস্ত সুবিধা।

আরো পড়ুন:  ডারউইন ছিলেন ঊনবিংশ শতকের ইংল্যান্ডের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের জীববিজ্ঞানী

এই সুবিধা যে কী বিপুল হতে পারে, রাজা হেরনের অনুরোধে জনসমক্ষে তারও প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিয়েছিলেন আর্কিমিডিস। একাধিক লিভার জুড়ে তৈরি কম্পাউন্ড বা সমন্বিত লিভারের সাহায্যে মাল ও যাত্রী বোঝাই একটি জাহাজকে এক হাতে বেলাভূমির উপরে অনেকখানি এমন ভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেন তা সমুদ্রের বুকে ভেসে চলছে। আর্কিমিডিস তাই গর্ব করে বলতেন, ‘আমাকে পৃথিবীর বাইরে একটা দাঁড়াবার জায়গা দিলে, আমি গোটা পৃথিবীটাকেই লিভার দিয়ে এক হাতে তুলে ধরতে পারি’।

ওয়াটার-স্ক্রু তার আর একটি চমকপ্রদ উদ্ভাবন। একটি ধাতব নলকে পাকানো স্ক্রুয়ের মতো করে বানিয়ে, সেটি একটি ফাপা সিলিন্ডার বা বেলনের মধ্যে বসিয়ে যন্ত্রটি তৈরি করেন আর্কিমিডিস। জলকে নিচ থেকে উপরে তোলার চমৎকার উপায় এই যন্ত্রটি। জাহাজের খোলে জমা জল বের করতে এটি ব্যবহার করা হতো।

বিশুদ্ধ গণিতে আর্কিমিডিসের কাজ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কোনও বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত প্রায় নিখুঁতভাবে নির্ণয় করেছিলেন তিনি। এটি একটি ধ্রুবক সংখ্যা, সব ধরনের বৃত্তের ক্ষেত্রেই যার মান একই থাকে। এর পরিচিত নাম ‘পাই’ (π)। আর্কিমিডিস নির্ণীত মান ছিল ৩১০/৭১ এবং ৩১/৭-এর মাঝামাঝি। এর প্রকৃত মান হলো ২২/৭ বা ৩.১৪১৫৯। স্ফিয়ার বা গোলক ও সিলিন্ডার বা বেলনের আয়তন এবং ক্ষেত্রফল নির্ণয় করেছিলেন তিনি। কারও কারও মতে, নিউটন ও লাইবনিৎজ-এর প্রায় ২০০০ বছর আগে ইন্টেগ্রাল ক্যালকুলাসের আবিষ্কর্তাও আর্কিমিডিস। তিনি প্রমাণ করেছিলেন একটি বেলনের মধ্যে মাপে মাপে বসানো গোলকের আয়তন ওই বেলনের আয়তনের দুই-তৃতীয়াংশ। এই কাজটি নিয়ে তাঁর এমনই গর্ব ছিল যে, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সমাধির উপরে যেন বেলনে প্রবিষ্ট গোলকের চিত্র খোদাই করা হয়।

মৃত্যুকালে আর্কিমিডিস

শেষ পর্যন্ত ২১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইরাকিউজের পতন হয় এবং রোমান সেনাদের হাতে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় শহর। হত্যা করা হয় বহু সাধারণ নাগরিককে। কিন্তু আর্কিমিডিসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রোমান সেনাপতি মার্সেলস নির্দেশ দিয়েছিলেন মহাবিজ্ঞানীর গায়ে যেন হাত না-পড়ে। তবে অনবধানে সেই নির্দেশ পালিত হয়নি। সাধারণ এক রোমান সেনার হাতেই তিনি নিহত হন।

আরো পড়ুন:  টাইকো ব্রাহে জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণের ধারণা বদলকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা

কীভাবে নিহত হন, সেও এক কাহিনি। আর্কিমিডিস যখন তার বাড়িতে একটি ঘরের মধ্যে গণিত চর্চায় মগ্ন ছিলেন, বালির উপরে আঁকছিলেন জ্যামিতিক চিত্র, তখন বাইরে শোনা যায় ঘোড়ার খুরের আওয়াজ এবং কোলাহল। কিন্তু তাতে কান না দিয়ে তিনি আঁকতেই থাকেন। এমন সময় একজন সেনা ঘরে ঢুকে তাকে কিছু প্রশ্ন করে। চোখ না তুলেই বিজ্ঞানী নাকি বলেছিলেন, ‘এখন বিরক্ত কোরো না’। রুষ্ট সৈনিক মুহুর্তে তরোয়ালের ঘায়ে তার মস্তক ছেদন করে। আর্কিমিডিসের এইভাবে মৃত্যুর খবর পেয়ে নাকি আফশোস করেছিলেন মার্সেলাস। সেনাপতির নির্দেশেই বিজ্ঞানীকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে সমাধিস্থ করা হয় এবং তার ইচ্ছানুসারেই সমাধিস্তম্ভের গায়ে খোদাই করে দেওয়া হয় বেলনে নিহিত গোলক।

তথ্যসূত্র

১. বিমল বসু, বিজ্ঞানে অগ্রপথিক, অঙ্কুর প্রকাশনী, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ মে ২০১৬, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!