অনুপ সাদির দুই দশকের কাজকর্ম

  • ইবাইস আমান, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

সময়টা ২০০২। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এমফিল করছি। আহমদ শরীফের বাসায় আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের নেতৃত্বে হাসান ফকরী ভাই, সুভাষ ভট্টাচার্য, নারায়ণ সরকার, তাহা ইয়াসিন, বাসুদেব বিশ্বাসদের সঙ্গে ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘে’র সাথে জড়িয়ে পড়লাম।

আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের বাসায় দেখলাম লম্বা চুলের বাউল ঘরানার একটা ছেলে খাতাকলম নিয়ে স্যারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। খুব মনোযোগ। আমার দিকে তাকানোর সময় নেই। প্রচ্ছন্নভাবে আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। নাম ধাম বিভাগ বিষয় জিজ্ঞেস করলে আন্তরিকতাহীন কণ্ঠে বলল শাইখ সাদি। ইংরেজি বিভাগে পড়ে। আমি অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে কলেজের শিক্ষক, অনুপ সাদি অনার্সের ছাত্র। বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট। ছেলেটাকে আর দশটা ছাত্রের থেকে ভিন্ন মনে হলো। চোখেমুখে বেশ ভূষায় অন্যরকম।

স্বভাব সুলভ ভাষায় বললাম–ও শেখ সাদী! বেশ! বেশ! পুলকিত হয়ে আরো কিছু কথা বলেছিলাম। কিন্তু আমার কথায় মনোযোগ না থাকলেও ওর মুখে মুচকি হাসির ঘাটতি ছিল না। মনোযোগ সব ফজলুল হক স্যারের দিকে। হাতে নিউজ প্রিন্টের খাতা কলম। একটা সময় অগ্রজ-অনুজের সম্পর্ক থেকে আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম।

তারপর স্বদেশ চিন্তা সংঘে যতবার দেখা হয়েছে, আমি সাদিকে মজা করে শেখ সাদী (রহঃ) বলে ডাকতাম। পরে লোকায়ত (আবুল কাসেম ফজলুল হকের সম্পাদিত পত্রিকা) ও নারী নামক সম্পাদনা গ্রন্থে দেখলাম শাইখ সাদি’র পরিবর্তে ‘অনুপ সাদি’।

কিছুদিন পর দেখলাম হুমায়ুন আজাদ’র সাক্ষাৎকার বিষয়ক লেখা নিয়ে তার ব্যস্ততা। তারপর দেখলাম ল্যাপটপের প্রতি প্রবল আগ্রহ! মতামত, নিবন্ধ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে কমেন্ট দেখার উদগ্র বাসনা। দু’চারটা কমেন্ট দেখেই আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের টানে বলছে–আমান ভাই, দ্যাখেন দ্যাখেন ১০/১৫ মিনিটের মধ্যেই কত কমেন্ট! কী আজিব জিনিস এই ল্যাপটপ ও ফেসবুক। আমান ভাই একটা ল্যাপটপ কেনেন। আমরা নায়েমে এক রুমে সিট নিতাম কেয়ারটেকার আনোয়ারকে বলে। আমি তখন বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজে আছি। অনুপ সাদি গফরগাঁও সরকারি কলেজে। দু’জনে টার্গেট করে নায়েমে উঠতাম।

ওই সময়কালে একবার সাদি’র আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার ব্যতিব্যস্ততা না বলে পারছি না। মাসখানেক আগে থেকে সাদি বলছে আমান ভাই–আয়কর মেলায় রিটার্ন জমা দিতে হবে। মিস করবেন না। আয়করের হিসাব নিকাশ নিয়ে বেশ বিচলিত। সবটা মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। নিজেরটা করে আমারটা নিয়ে বসছে। আমার সম্পদের হিসাব ও অন্যান্য তথ্য জেনে নেয়ার ফাঁকে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ছে।  ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়ানোর জন্য সঠিক হিসাবটা বুঝার জন্য সাদিকে জিজ্ঞেস করলে কনফার্ম করে বলতে দ্বিধাগ্রস্ত  হচ্ছে। মাথা ঘামিয়ে হিসাব মেলানোর পর চোখেমুখে বিজয়ানন্দের হাসি নিয়ে বলছে, ভাই ৫০০ টাকার কাজ করে দিলাম। ‘অন্তরে’ রেস্তোরাঁতে খাওয়াতে হবে। অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে করলে ১০০০ টাকা নিতো। আমরা তখন প্রায়শঃই আজিজ মার্কেটের ‘অন্তরে’ রেস্তোরাঁয় টাকি মাছের ভর্তা ও হরেক রকমের ভর্তা দিয়ে তৃপ্তি সহকারে ভাত খেতাম।

সাদি সব সময় কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ব্যবহার করতো। ব্যাগে বিভিন্ন ধরনের বই পুস্তক পত্র পত্রিকা ঠাসা থাকতো। বেশি থাকতো মার্কস লেনিন মাও সেতুঙের বই। কিছুদিন পর ব্যাগ থেকে বের করে দেখাল শত শত পশু, পাখি, জীবজন্তু, লতা-গুল্ম, বৃক্ষের নাম কুলপঞ্জি বেড়ে ওঠা ও বিলীন হবার আদ্যপান্ত কাসুন্দি।

বিহঙ্গ, বৃক্ষের প্রতি তার দরদ মনে রাখার মত। যেসব প্রজাতির পশু-পাখির বিলুপ্তির জন্য আমাদের পরিবেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার দীর্ঘ তালিকা। শুধু তালিকা নয়। কী উপায়ে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তার কর্ম পরিকল্পনা। 

একবার ফোন করে বলল–আমান ভাই, সাতক্ষীরায় আপনার বাড়ি আসছি। ঢাকা থেকে সড়কপথে আমার বাড়ি আসার পথঘাট সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিল। ভোর বেলা অনুপ সাদি আমার বাড়ি হাজির। রেস্ট না নিয়েই কর্ম পরিকল্পনার কথা বলতে লাগল। পশু-পাখির ছবি সম্বলিত ব্যানারের মত অনেক অনেক কাগজ বের করে অনর্গল সেসবের ব্যাখ্যা করে যাচ্ছে। একটা হুতোম পেঁচা কতটা ইঁদুর নিধন করতে পারে, কতটা ইঁদুর নিধন হলে কতটা ফসলের ক্ষতি এড়ানো যায় ইত্যাদি। আমাদের এলাকার কয়েকটি হাট বাজারে পোস্টার টাঙিয়ে বন্য পশু-পাখির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করেছিলাম। জনগণের সাড়াও পেয়েছিলাম। তার পরামর্শে সাংবাদিক ডেকে প্রেস ব্রিফিং দেয়া হয়েছিল। আমাদের বাড়ির শান বাধানো বড় পুকুর দেখে সাদি খুব খুশি। পুকুরে আনন্দের সাথে সাঁতার কাটলো কিছুক্ষণ। সাঁতরিয়ে এপার ওপার করল।

কেউ কেউ এসব উদ্যোগকে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মনে করে বা নিছক পাগলামি মনে করে। আমি তা ভাবিনি। বরং গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি।

তারপর দেখলাম বাংলা বাজারে প্রকাশকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রয়াস। হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য বিষয়ের বইটি প্রস্তুত হবার পর বাঙালির বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা প্রকাশিত হলো। ২০১৩ সালে আমি স্বপরিবারে সেন্টমার্টিন গেলাম। অনুপ সাদি ও দোলন প্রভা আমাদের সাথে যোগ দিল। জাহাজে চড়ে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অনেক স্মৃতি আছে আমাদের। বিশেষ করে দোলন ও আবৃতার ছবিগুলো দেখলে সেসব স্মরণীয় স্মৃতিগুলো কথা কয়ে ওঠে।

কোনো এক ঈদের ছুটিতে বিরিশিরি, সুসাং দুর্গাপুর দেখার জন্য সাদির ওখানে গেলাম। সাদি তখন ময়মনসিংহ সরকারি কলেজে ইংরেজির সহকারি অধ্যাপক। সাদি আমার সাথে বিরিশিরি না গেলেও পানিহাতা গিয়েছিল। দুর্গম এলাকা। যানবাহন বলতে ভ্যান রিকসা। বনজঙ্গল পেরিয়ে টিলার উপরে উঠলাম। একটা আশ্রম জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যিশু খ্রিস্টের স্ট্যাচু। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভোগাই নদীটি বাংলাদেশ-ভারতকে কিছুটা বিভক্ত করে রেখেছে। টিলার ওপরে অনেক সময় ধরে বসে ভারতের ভূপ্রকৃতি, শস্য, বৃক্ষাদি দেখছিলাম আর আমার বাংলাদেশের সাথে মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলাম।

সেসময় সাদির বাসায় রীতিমত বিভিন্ন ধরণের শাকান্নভোজের সাধনা চলছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে সংগৃহীত লতা পাতা শাকসবজির গুণাগুণ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করল। আন্ডার গ্রাউন্ড মার্কা বাসায় থাকে। বাসাটার কলেবর ছোট হলেও বই পুস্তকের আলমারি দেখে অবাক হবার মতো। ছোট বড় গুরুত্বপূর্ণ বই পুস্তক ভরা আলমারি। রসিয়ে রসিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল আমার সংগ্রহে তিন হাজার বই আছে। বইগুলো দেখে অবাক হলাম। আমারও ব্যক্তিগত লাইব্রেরি আছে। কিন্তু অনুপ সাদির লাইব্রেরির মতো গুরুত্বপূর্ণ বই কম আছে। বইগুলো দেখছিলাম আর মনে করছিলাম এসব বই কত খুঁজেছি অথচ পাইনি! আমি অবাক হই আর সাদি মিট মিট করে হেসে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের ভাষায় বই পুস্তক সংগ্রহের কথা বলে যায়। ওই সময় বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামে একটি বই আমাকে সম্পাদনার প্রস্তাব দিয়ে, লেখক তালিকা সম্পর্কে বলেছিল। আমি যতীন সরকারের লেখাটা সংগ্রহের জন্য সাদিকে বলেছিলাম। ব্যক্তিগত আলস্য ও পারিবারিক ঝামেলার কারণে অনেক অনেক লেখার পরিকল্পনা করে কল্পনায় হারিয়ে ফেলার মতো বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিষয়ক প্রবন্ধ লেখা ও সেই সম্পর্কে লেখা প্রবন্ধগ্রন্থ সংগ্রহের ও সম্পাদনা করার কাজটি আর আমার করা হয়নি।  সাদি’র সম্পাদনায় বইটি প্রকাশিত হবার পর কিছুটা আফসোস যে করিনি, তা নয়। সাদি অবশ্য বইটি সম্পাদনাকালে আমাকে একটি প্রবন্ধ লিখতে বলেছিল, লিখি লিখি করে লেখা হয়নি।

অনুপ সাদি সম্পর্কে অনেক কথা বলা যায়। সে একজন শতভাগ সৃষ্টিশীল মানুষ। আমরা সাধারণত জানি বা অনেকে বলে থাকেন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা অলস প্রকৃতির হয়। অনুপ সাদিকে দেখলে সেটা ভুল প্রমাণিত হবে। একদিন আমাকে তার লেখা কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি দিয়েছিল। পড়ে দেখলাম গদ্যাকারে লেখা কবিতাগুলো। মাটিমগ্ন মানুষের চেতনা। বিভিন্ন জনপদের ইতিহাস, বিবর্তন, বিদ্রোহের সাথে নতুন সমাজ নির্মাণের প্রত্যয়। বণিক পুঁজির ক্লেদাক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উপেক্ষা ও ঘৃণা।

‘কর্মই ধর্ম’ এ বাক্যটি অনুপ সাদির ক্ষেত্রে খুব প্রাসঙ্গিক। ঘড়ির কাঁটার সাথে চলতে অভ্যস্ত। কোনো আলস্য বা ভাবালুতা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। ওই সময় দেখতাম তার গলায় ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা। পড়ছে অথবা ল্যাপটপের মধ্যে বুঁদ হয়ে আছে, খুশ খুশ করছে আর বার বার গলায় হাত দিচ্ছে। কিন্তু একাগ্রতার কোনো ঘাটতি নেই।

আমরা সমাজ, দেশ, কাল নিয়ে কথা বলতাম। বিশেষ করে মার্কস, লেনিন, মাও সেতুং-এর রাজনৈতিক চিন্তাধারার আলোচনা হতো। দেখতাম আমাদের দেশের বামপন্থীদের প্রতি তার ক্ষোভ। নীলক্ষেতে ঘুরে মার্কস, লেনিন, মাও সেতুঙের দুষ্প্রাপ্য বই-পুস্তক সংগ্রহ করে, ২০/৫০টি জেরক্স কপি করে বাঁধাই করে কাঁধে ঝুলানো কাপড়ের ব্যাগে ভরছে। ব্যাগের ভারে ঘাড় বেঁকে যাচ্ছে। আমার হাঁটতে ভাল লাগতো, আমি আজিজ মার্কেট বা নীলক্ষেত থেকে পায়ে হেঁটে নায়েমে যাতায়াত করতাম। সাদি মোটেই হাঁটতে চাইতো না। বলা যায় হাঁটতে পারতো না। মুখরোচক খাবারে আমারে থামায় কে। সাদি’র খাবারে আসক্তি কম। অল্প খায়। স্বপ্ন দেখে, চিন্তা করে বেশি। কাজ করতে চায় আরো বেশি।

২০১৯ সালে হাসান ফকরী, চিনু কবির, অজয় কুমার রায়, আশিক আকবর ও দোলন প্রভাসহ কিছু সিগারেট ফুঁকা ছেলেমেয়ে নিয়ে সাদি খুলনায় আসলো ‘অবরুদ্ধ সময়ের কবিতা’ শীর্ষক শ্লোগান নিয়ে। খুলনার উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরির হলরুমে কবিতা পাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠান করল। অজয়, দোলন ও গ্রুপের অন্যরা কবিতা আবৃত্তি ও ফটোসেশন করলো মহা আনন্দে। স্বদেশ চিন্তা সংঘের সদস্য, পরবর্তিতে সরকারি সুন্দরবন কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক বাসুদেব বিশ্বাস এ-আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।

২০১৯ সালে আমার সহকর্মী হেলালের সাথে ভারতে গিয়েছিলাম। দার্জিলিঙে ভ্রমণ করে কলকাতায় ফিরে অনুপ সাদি ও দোলন প্রভার সাথে সাক্ষাত হলো। দোলনের পছন্দের সরিষা বাটা দিয়ে কচুশাক ধানসিঁড়ি হোটেলে খেয়ে অমৃতের স্বাদ পেয়েছিলাম। এখনও মনে হলে জিবে জল এসে যায়। অপেক্ষায় আছি। কলকাতায় গেলে প্রথমে ওই কচুশাক নামের অমৃতের স্বাদটা আগে নেবো। খাওয়া শেষে সাদির সাথে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কফি হাউজে গেলাম। গিয়ে দেখলাম আমাদের সবার প্রিয় হাসান ফকরী ভাই, সমীরণ মজুমদার ছাড়াও কলকাতার বেশ কয়েকজন কবি, সাহিত্যিক। তখনও জানতাম না হেলালের সাথে হাসান ফকরীর পরিচয়টা এতটা গভীরে। সেবার সাদি-দোলন বার বার বলছিল দমদমের এলাকার হোটেলে থাকার জন্য। কিন্তু হেলাল নিউমার্কেট ও শ্রী লেদারে কেনাকাটার জন্য দমদমে গেল না। যেহেতু হাতে ছুটি ছিল সেহেতু আমি সাদিদের সাথে আরো ২/৪ দিন থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হেলালের বাড়ি ফেরার তাগিদে সেটা সম্ভব হয়নি। 

আরো অনেক স্মৃতি আছে সাদির সাথে আমার। উল্লেখযোগ্য কিছু বললাম। সাদির লেখালেখি, সাহিত্যকর্মের প্রসঙ্গ এখানে কিঞ্চিত উল্লেখ করেছি মাত্র। শতভাগ কর্মযোগী, অনলস পরিশ্রমী, তীক্ষ্ণ চিন্তার, ধীশক্তিসম্পন্ন এ মানুষটিকে আমরা, আমাদের সমাজ কাজে লাগাতে পারছি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা; পরিতাপের ও লজ্জার।

কয়েক বছর ধরে সে মফস্বল কলেজে পড়ে আছে। ঢাকায় কত মানুষের বদলি হচ্ছে, সাদির হচ্ছে না। ঢাকার কলেজগুলোতে যুগ যুগ ধরে থেকে চাকরি জীবন পার করছে কত আনপ্রোডাক্টিভ লোক অথচ সাদির মত প্রোডাক্টিভ মানুষ ঢাকায় বদলি নিতে পারছে না।

শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাহীন দূরবস্থার বিষয়ে আমাদের মধ্যে কথা হয়। কয়েক বছর আগে সাদি স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও কাজ করার জন্য বারবার চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথা বলতো। ২০১৫ সালে আমাদের বেতন স্কেল বাড়ার পর মনে হয় সে চিন্তাটা গেছে। তাছাড়া চাকরি ছেড়ে এখন বাংলাদেশে লেখালেখি করে কি জীবনযাপন সম্ভব? সেটাও সাদিকে ভাবতে হচ্ছে।

আমার লেখা গল্পগ্রন্থ বেনোজলের বন্যা অন্য তিনজনের সাথে সাদিকে উৎসর্গ করা। ‘নতুন পোষাক ও মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘বছর কুড়ি পরে’ গল্পে সাদির কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে প্রসঙ্গক্রমে তার নাম উল্লেখ করেছি।

দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে মনিষার লালন ও পরিচর্যা, যেভাবে হওয়ার দরকার ছিল, সেভাবে হয় না। পরিবার ও সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রভৃতি কারণে সৃষ্টিশীলতা ভীষণভাবে মার খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সৃষ্টিশীল ব্যক্তি এখানে বিচ্ছিন্ন থেকে বিচ্ছিন্নতর পর্যায়ে অবস্থান করে জীবনের দায় মেটাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সৃষ্টির সোনাধান গোলায় তোলার আগেই হায়েনারা গ্রাস করতে উদ্যত। তবুও সংসপ্তকের মত অনুপ সাদিরা লড়ে যেতে চায়, লড়ে যায়।

২৩-২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, যশোর।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: অনুপ সাদির দুই দশকের কাজের এই মূল্যায়নটি এনামূল হক পলাশ সম্পাদিত সাহিত্যের ছোট কাগজ অন্তরাশ্রম-এর অনুপ সাদি সংখ্যা, সংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ১৩-১৪, ময়মনসিংহ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২২ তারিখে প্রকাশিত এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!